সিদ্ধান্তহীনতায় বিএনপি

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৫, ০০:০৪

নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা-গণসংযোগ শুরু করেছেন ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন। কাউন্সিলর পদেও দল সমর্থিত একক প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করেছে আওয়ামী লীগ। আজকালের মধ্যে তাদের তালিকাও প্রকাশ করবে দলটি। এমনকি এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ (জাপা) অন্যান্য দল সমর্থিত ও স্বতন্ত্র্ত্র মেয়র প্রার্থীরাও প্রচারণা শুরু করেছেন। তবে সিদ্ধান্ত ও পরি-কল্পনাহীনতার কারণে এই দৌড়ে এখনও বহুদূর পিছিয়ে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট।

ঢাকা দক্ষিণে দল ও জোট সমর্থিত একক প্রার্থী হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নাম ঘোষণা করলেও এখনও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি তাকে। আর উত্তরে আবদুল আউয়াল মিন্টু আপিল বিভাগেও হেরে গেলে তার বিকল্প প্রার্থী হিসেবে কাকে সমর্থন দেয়া হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিএনপি। মিন্টুর বিকল্প হিসেবে বিকল্পধারার যুগ্ম-মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরীর নাম আলোচনায় এলেও তার বিষয়ে জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের শরিকদের কারও কারও ঘোর আপত্তি রয়েছে। একইভাবে উত্তরে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মিন্টুপুত্র তাবিথ আউয়ালকে সমর্থন করার বিষয়েও বহুমত দেখা দিয়েছে বিএনপিতেই।
শুধু উত্তরে বিকল্প মেয়র প্রার্থীর বিষয়েই নয়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে দল বা জোট সমর্থিত একক কাউন্সিলর প্রার্থী ঠিক করার বিষয়েও বিএনপির এখন পর্যন্ত ঘোষিত বা দৃশ্যমান কোনো পরিকল্পনা নেই। এ লক্ষ্যে গতকাল পর্যন্ত দেখা যায়নি কোনো প্রক্রিয়া বা কর্মতত্পরতাও। দল-জোটের এরকম অগোছালো অবস্থার কারণে উত্তর ও দক্ষিণে বিএনপিসহ ২০ দলের যাদের কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে, তারা আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামতে পারছেন না। বলতে গেলে একরকম হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে দল-জোটের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মুখিয়ে রয়েছেন তারা। এ নিয়ে গত কয়েকদিনে ইত্তেফাকের সঙ্গে পৃথক আলাপকালে অস্বস্তি ও মনোকষ্টের কথাও প্রকাশ করেছেন কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়া বিএনপি দলীয় বেশ কয়েকজন।
এসব বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘এটা তো দলীয় নির্বাচন নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তো এখানে প্রার্থী ঠিক করে দেয়ার কথা নয়। আওয়ামী লীগ যদি সেটি করে থাকে, তাহলে সেটি তাদের বিষয়। বিএনপি কেন তাদেরকে অনুকরণ করতে যাবে।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু তার মনোনয়নপত্র বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে করা রিট খারিজের বিরুদ্ধে গতকাল সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আপিলের সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত মিন্টুর অপেক্ষায় থাকবে বিএনপি। তবে এ জন্য বিএনপিকে অন্তত আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এ বিষয়ে শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য্য করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত।
মিন্টু যদি শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগেও হেরে যান, তাহলে উত্তরে তার বিকল্প মেয়র প্রার্থী হিসেবে দল বা জোটগতভাবে কাকে সমর্থন দেয়া হবে কী হবে না, সে ব্যাপারে গতকাল পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখতে পারেনি বিএনপি। বিকল্প প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন মিন্টুপুত্র তাবিথ আউয়াল ও বিকল্পধারার যুগ্ম-মহাসচিব মাহী চৌধুরী।
২০ দল শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন ‘রাজনৈতিক কৌশলে বিএনপির বারবার ভুলের কারণে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে মাশুল দিতে হচ্ছে। একের পর এক ভুলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি পদে-পদে হোঁচট খাচ্ছে। এবার যদি মাহী চৌধুরীকে জোটগত সমর্থন দেয়া হয়, তাহলে সেটি হবে বিএনপির সর্বশেষ বড় ভুল। কারণ বিএনপি নেতারা একাধিকবার বি. চৌধুরীর (বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী) বাসায় গিয়ে অনুরোধ জানালেও বিকল্পধারা ২০ দলে সম্পৃক্ত হয়নি। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চেও উঠেছিলেন মাহী, যা ছিল ২০ দলের তখনকার রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কথিত আছে, বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান নাকি বলেছিলেন-আমার লাশও বিএনপির জোটে যাবে না। এই অবস্থায় এলডিপি কিছুতেই মাহীকে সমর্থন দিতে পারে না। বিএনপি তাকে সমর্থন দিলে এলডিপি ২০ দলের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখার বিষয়ে নতুন করে ভাববে। কেননা রাজনীতির ন্যূনতম নীতি-আদর্শ থাকা উচিত। কারও নাটকের সঙ্গে নীতিকে গুলিয়ে ফেলা সমীচীন নয়।’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একজন সদস্য ইত্তেফাককে জানান, যুদ্ধাপরাধ বা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ সম্পর্কে অধ্যাপক বি. চৌধুরীর বিকল্পধারার অবস্থান ছিল জামায়াতের বিপরীত। এছাড়া জামায়াত থাকায় ২০ দলে যুক্ত হবে না বলেও বিকল্পধারা একাধিকবার বলেছে। এ কারণে রাজনৈতিক ও নীতিগত অবস্থানের কারণেই জামায়াত মাহী বি. চৌধুরীকে সমর্থন করতে পারে না।
২০ দল শরিক ডেমোক্রেটিক লীগের (ডিএল) মহাসচিব সাইফুদ্দিন মনিও শাহাদাত হোসেন সেলিম ও জামায়াতের এই নেতার বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে ইত্তেফাককে বলেন, ‘মাহী বিএনপির কেউ নন, ২০ দলেরও কেউ না। তার বাবা (বি. চৌধুরী) রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বড় ক্ষতি করেছেন।’ ২০ দল শরিক ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তুজা ইত্তেফাককে বলেন, ‘মাহী বিএনপি বা ২০ দলের কেউ নন। মিন্টু না থাকলে তার ছেলে তাবিথ থাকবে। কিন্তু বাইরের কারও কথা আসবে কেন?’
২০ দল শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়াও ইত্তেফাককে বলেন, ‘সুবিধাবাদীরাই রাজনীতিকে নষ্ট করছে। এক সময় যারা বলতো ২০ দলে গেলে তাদের নাকি জাত যাবে, এখন তারা সেই জামায়াতযুক্ত ২০ দলের সমর্থন চায় কীভাবে! এছাড়া জাতীয়তাবাদী শক্তির আজ যে দুঃসময় চলছে সেটির জন্য বি. চৌধুরীর অবদানও কম নয়। এছাড়া কথিত ১/১১-এর সমর্থকও ছিল এই বিকল্পধারা। সুতরাং অতীত মনে রেখে এদের কাছ থেকে ২০ দলকে সাবধান থাকতে হবে।’
২০ দল শরিকদের কারও কারও এ রকম আপত্তির জবাবে মাহী বি. চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘২০ দলের শরিক না হলেও কিংবা মাঠে না নামলেও ২০ দলের দাবি ও কর্মসূচির প্রতি বিকল্পধারার প্রকাশ্য সমর্থন ছিল এবং রয়েছে। এখন বিএনপিতে না থাকলেও আমি তো বিএনপিরই ঘরের ছেলে। আমি ও আমার পরিবার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের চেতনায় বিশ্বাসী। আমি শুরু থেকেই শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করি। আমি এই দলের এমপি ছিলাম। এরকম নানা কারণেই বিএনপিসহ ২০ দলের সমর্থন দাবি করার অধিকার আমার রয়েছে। বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকসহ সাধারণ ভোটারদের কাছেও আমার সেই দাবি আছে।’
২০ দলের কেউ কেউ মাহীর বিষয়ে প্রবল আপত্তি জানালেও জোটের শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘মাহীকে তো এখনও সমর্থন দেয়া হয়নি। মিন্টু না থাকলে তার ছেলে তাবিথ আছে। তাবিথও না থাকলে সেক্ষেত্রে ২০ দল প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়া যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটিই আমাদের সবার সিদ্ধান্ত হবে।’
তবে বিএনপির কারও কারও মতে, মিন্টুর বিকল্প হওয়ার মতো রাজনৈতিক অবস্থান নেই তাবিথের। রাজনীতির ময়দানে তাবিথের পরিচিতি কম। সেই তুলনায় মাহী পরিচিত মুখ।
মিন্টুর বিকল্প প্রার্থী নিয়ে দল-জোটে থাকা এরকম নানা মত সম্পর্কে তাবিথ আউয়াল গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আসলে আমার মাথায় এখন অন্যকিছু কাজ করছে না। শুধু রিট, আপিল, আইনী বিষয়— এসব নিয়েই এখন ব্যস্ত আছি।’

এদিকে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে দল-জোট সমর্থিত একক কাউন্সিলর প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এখনও শুরু করতে পারেনি বিএনপি। ঢাকা দক্ষিণের ২ নম্বর ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী, খিলগাঁও থানা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হাবিবা চৌধুরী (বিধি) ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা দলের চেয়ারপার্সন ও মির্জা আব্বাসের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি।’ একইভাবে ঢাকা দক্ষিণের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি আবুল হোসেন জানান, তার এখানে জামায়াতের শহীদুল ইসলামও মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এখন দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন তিনি। এভাবে দুই সিটি করপোরেশনে কাউন্সিলর পদে বিএনপিসহ ২০ দলের অন্য যাদের কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই তাকিয়ে আছেন দল-জোটের সিদ্ধান্তের দিকে।