তারেক আরিফ রানা নূর হোসেনসহ অভিযুক্ত ৩৫

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৫, ২৩:২০

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় করা দুইটি মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) গতকাল বিকালে আদালতে দাখিল করেছে পুলিশ। চার্জশিটে র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক উপ-অধিনায়ক মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) এম এম রানাসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে র্যাবের সদস্য ২৫ জন। ভারতে গ্রেফতার ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ১০ জন সাধারণ মানুষ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ ডিবির ইন্সপেক্টর মামুনুর রশিদ মণ্ডল জেলার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রূপমের কাছে চার্জশিট জমা দেন। চার্জশিটে ৩৫ আসামির মধ্যে ২২ জন বর্তমানে কারাগারে আটক আছেন। চার্জশিটে ১২৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও ১৬২টি আলামত সংগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুইটি মামলারই চার্জশিট ১৭ পৃষ্ঠা করে। এর সঙ্গে প্রায় ৮শ পৃষ্ঠা করে নথিপত্র (ডকেট) দাখিল করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ২১ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, মেজর (অব.) আরিফ ও নূর হোসেন হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন। আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতেই এই হত্যাকাণ্ড বলে মনে করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। অপহরণ থেকে শুরু করে লাশ নদীতে ফেলা পর্যন্ত সঙ্গে ছিলেন মেজর (অবঃ) আরিফ। আর আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার চালক পরিস্থিতির শিকার।
আলোচিত এই দুইটি মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর আমরা এই আলোচিত ঘটনা উদ্ঘাটন করে চার্জশিট দিতে সক্ষম হয়েছি।’ একটি মামলার তদন্তের জন্য এটা লম্বা সময় কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি যত বড় সে হিসেবে আমাদের নেয়া সময় খুব বেশি নয়। কারণ এখানে আসামি কারা তাও আপনারা জানেন।’ চার্জশিটে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে এজাহারভুক্ত ৫ আসামিকে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট দাখিলের পর নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রূপমের আদালত ১১ মে শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
অব্যাহতিপ্রাপ্ত এজাহারভুক্ত ৫ আসামি হলেন— সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিন মিয়া, ইকবাল হোসেন, হাসমত আলী হাসু, থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রাজু ও আনোয়ার হোসেন। এছাড়া গ্রেফতারকৃত আরো ১১ জনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তাদের কোন সম্পৃক্ততা পায়নি পুলিশ। তারা হলেন- নূর হোসেনের বডিগার্ড মহিবুল্লাহ, তানভীর, ইয়াসিন, আলমগীর, গাড়ি চালক সোনা মিয়া, জুয়েল আহম্মেদ, মিজান, আবদুর রহিম, আরিফুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান। 
চার্জশিটভুক্ত ৩৫ জনের মধ্যে ২২ জন বর্তমানে গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন— লে. কর্নেল (অব.) তারেক মোহাম্মদ সাঈদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানা, ল্যান্সনায়েক বিল্লাল হোসেন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, হাবিলদার ইমদাদুল হক, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স কর্পোরাল রুহুল আমিন, সিপাহী আবু তৈয়ব, কনস্টেবল সিহাব উদ্দিন, রেডিও অপারেটর গেইন (আরওজি) আরিফ হোসেন, এএসআই বজলুর রহমান, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, হাবিলদার ও গাড়ি চালক নাসিরউদ্দিন, সিপাহী নূরুজ্জামান, বাবুল হাছান, সিপাহী সাবেক সেনা সদস্য আসাদুজ্জামান এবং  নূর হোসেনের প্রধান বডিগার্ড মর্তুজা জামান চার্চিল, প্রধান ক্যাশিয়ার আলী মোহাম্মদ, ক্যাশিয়ার সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক আবুল বাশার, মাদক স্পট, জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য পরিচালনাকারী রহম আলী ও মিজানুর রহমান।
এছাড়া যে ১৩ জন পলাতক রয়েছেন তারা হলেন- নূর হোসেন, তার সহযোগী ভারতে গ্রেফতার সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন। র্যাবের ৮ জন পলাতক। তারা হলেন— কর্পোরাল লতিফুর রহমান, সৈনিক আবদুল আলী, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, সৈনিক আলামিন শরীফ, সৈনিক তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবির, এএস আই কামাল হোসেন ও কনস্টেবল হাবিবুর রহমান।
আলোচিত এই ঘটনায় যে দুইটি মামলা হয়েছিল তার একটি করেছিলেন নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। এই মামলায় কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান করে ৬ জনকে আসামি করা হয়েছিল। এরমধ্যে নূর হোসেনকে গত বছরের ১৪ জুন ভারতের কলকাতায় গ্রেফতার করা হলেও এজাহারভুক্ত অপর ৫ আসামি রয়েছেন পলাতক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
এদিকে ৫ জনকে অব্যাহতি দেয়ায় বুধবার বিকালে আদালতে উপস্থিত হয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন একটি মামলার বাদি সেলিনা ইসলাম বিউটি। তিনি জানান, এজাহারভুক্ত আসামিদের অব্যাহতি দেয়ায় তিনি অচিরেই আইনগত ব্যবস্থা নিবেন। অন্যদিকে চন্দন সরকার ও গাড়ি চালক ইব্রাহিমকে অপহরণ ও হত্যা মামলার বাদী ছিলেন চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। এ মামলায় আসামি অজ্ঞাত করা হয়েছিল।
গত বছরের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়ি চালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার ব্যক্তিগত গাড়ি চালক ইব্রাহিম অপহূত হন। পরদিন ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান করে মামলায় আসামি করা হয় ৬ জনকে। ৩০ এপ্রিল বিকালে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল, পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন।

এ হত্যাকাণ্ডের পর নজরুল ইসলামের শ্বশুর অভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন নূর হোসেন। এ অভিযোগের পর গত ৬ মে তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে এ তিনজন গ্রেফতারের পর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।