প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত অবরোধ-হরতালের নামে তিন মাস ধরে নারী-শিশু, অন্তঃসত্ত্বা মহিলাসহ নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা ও দেশের সম্পদ ধ্বংস করেছে। সরকারি অফিস-আদালতের সঙ্গে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বিদ্যুত্ কেন্দ্রও। রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ইঞ্জিনিয়ারদেরও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। এটা সত্যিই দুর্ভাগ্য ও দুঃখজনক ঘটনা। সত্যিকারের কোনো রাজনীতিবিদ যার দেশের জন্য এতটুকু ভালোবাসা আছে, দরদ আছে, মায়া আছে বা দেশের স্বার্থের জন্য যে রাজনীতি করে সে কখনোই এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করতে পারে না। গত তিন মাসে দেশে যে নৈরাজ্য ঘটেছে তার উত্তরণ ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও তাদের কর্মতত্পরতা জোরদার করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়গুলো পরিদর্শনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল দ্বিতীয়বারের মতো এ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে যান।
পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রণালয়টির ইতোমধ্যে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন, অগ্রগতি ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
মতবিনিময়কালে শেখ হাসিনা বলেন, এ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর পরিশ্রমের কারণে মাত্র ছয় বছরে বিদ্যুতের উত্পাদন তিন হাজার মেগাওয়াট থেকে ১৩ হাজার ২৬৫ মেগাওয়াটে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুত্ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কর্মতত্পরতায় এ খাতে বাংলাদেশ এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, যা বিশ্বের অনেক দেশকে বিস্মিত করেছে। পারমাণবিক ও বিদেশ থেকে বিদ্যুত্ আমদানিসহ বহুমুখী বিদ্যুত্ উেসর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুত্ পাচ্ছে। সব বাড়িতে বিদ্যুতের আলো জ্বলতে আর বেশি সময় লাগবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের যে বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জিত হয়েছে সেখানে গ্যাসের পাশাপাশি তেল পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। আর এজন্য অনুসন্ধান কার্যক্রম আরো জোরালো করতে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেন তিনি। বৈঠকে গ্রাম পর্যায়ে বিদ্যুত্ সরবরাহ বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, গ্রামে বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়লে শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে, মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
শতভাগ বিদ্যুত্ দিতে হলে গ্রামের মানুষকেই বেশি বিদ্যুত্ দিতে হবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের উন্নয়নের যে লক্ষ্য সেটার মূল কথাটা হলো, আমরা শুধু শহরের মানুষের সুখ-সুবিধা দেখব না। প্রত্যন্ত অঞ্চল, গ্রামের মানুষদের চাহিদা পূরণ করা, তাদের জীবনমান উন্নত করা, তাদের জীবনটাকে আরো সুন্দর করাই আমাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘পল্লী জনপদ’ নামে গ্রামের মানুষের জন্য সরকার যে ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরির প্রকল্প নিয়েছে সেখানে কম খরচে বিদ্যুত্ সরবরাহ দেয়া যাবে।
শেখ হাসিনা বলেন, রপ্তানি বাড়াতে গেলে আরো শিল্প-কলকারখানা গড়ে তুলতে হবে। সাতটি বিভাগে সাতটাসহ মোট ২১টা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জায়গা নির্দিষ্ট করেছি। অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য যে জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়েছে সেখানে একটি করে বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে সেখানে গ্যাস সরবরাহের বিষয়েও এখন থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার চেষ্টা করছে। অথচ জ্বালাও-পোড়াও করে তারা (বিএনপি) দেশের বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়াতে আমরা বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়েছি। যেমন সোলার এনার্জিটাকে আরো কাজে লাগাতে হবে। তার সরকারের সময় ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এটাও বাংলাদেশ একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে বিদ্যুত্ আমদানি করা, এটা অতীতে এ অঞ্চলে ছিল না। ভারত ছাড়াও নেপাল ও ভুটান থেকে আরো বিদ্যুত্ কেনার সম্ভাবনার কথাও জানান তিনি। নতুন যন্ত্রপাতি বসিয়ে পুরনো জরাজীর্ণ বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো সংস্কার করে জ্বালানি খরচ কমানোর দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে আরো ১২টি বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী স্বল্প সময়ের মধ্যে বিরক্তিকর বিদ্যুত্ বিভ্রাট থেকে দেশকে স্বস্তি দিতে ও বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়াতে নিরলস পরিশ্রমের জন্য বিদ্যুত্ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, অনেকে অনেক কিছু বলতে পারেন। কিন্তু যখন দেশের মানুষ এমনকি রাজধানীর নাগরিকরা তীব্র বিদ্যুত্ সংকটে ভুগছিলেন, সে সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন কাজ ছিল।
সূত্র জানায়, মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ না দিয়ে শিল্পখাতে গ্যাস সংযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) শিল্প ও কলকারখানায় দ্রুততার সঙ্গে গ্যাস সংযোগের নির্দেশ দেন। আগামী ৩ বছরের মধ্যে সারা দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে এলপি গ্যাস পৌঁছে দিতে তাগিদ দেন শেখ হাসিনা।
মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুত্ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী বীর বিক্রম, প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, সংশ্লিষ্ট সচিবগণ, মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।