অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন দেশে চিকিৎসাসেবার পরিধি ও মান দুই-ই বাড়িয়াছে। উপজেলা পর্যায়ে তো বটেই, প্রত্যন্ত গ্রামেও সাধারণ রোগ-ব্যাধিতে মানুষ সহজেই সেবা পাইতে পারেন। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই আছে এক বা একাধিক সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। আছে কমিউনিটি ক্লিনিক। কোথাও কোথাও আছে দাতব্য চিকিৎসালয়। এতদ্ব্যতীত কোনো কোনো বেসরকারি সংস্থাও (এনজিও) প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়া যাইতেছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উপজেলা সদর এবং ক্ষেত্রবিশেষে ব্যস্ত-বর্ধিষ্ণু ব্যবসাকেন্দ্রেও ক্লিনিক-হাসপাতাল গড়িয়া উঠিয়াছে। গ্রামের সামর্থ্যবান মানুষ সেইসব ক্লিনিক হইতে সেবা গ্রহণ করিতে পারেন। নজরদারি বাড়ানোর ফলে মফস্বলের সরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালসমূহে চিকিত্সক উপস্থিতির হারও পূর্বের তুলনায় বাড়িয়াছে। সব মিলাইয়া, স্বীকার করিতেই হইবে যে, স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি এক্ষণে হতাশাজনক নয়। তারপরও কিছু কিছু সমস্যা আছে, যেইগুলির সমাধান হইয়া গেলে সেবার মান ও কার্যকারিতা বাড়িতে পারে। সামপ্রতিক এক জরিপ ফলাফলে সেই দিকটাই প্রতিফলিত হইয়াছে।
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, ৭৪ শতাংশ ক্লিনিক-হাসপাতালে মৌলিক সরঞ্জামের অভাব রহিয়াছে। মৌলিক সরঞ্জাম বলিতে এমন কিছু সাধারণ যন্ত্রপাতি বোঝায়, যেইগুলি ছাড়া কোনোরকম চিকিত্সা চলিতে পারে না। থার্মোমিটার, স্টেথিস্কোপ, রক্তচাপ মাপিবার যন্ত্র,ওজন নেওয়ার মেশিন প্রভৃতি ছাড়া ডাক্তারের পক্ষে রোগের প্রাথমিক উপসর্গগুলিও নির্ণয় করা কঠিন। এইসব সরঞ্জাম অতীতের নগ্নপদ ডাক্তারগণেরও ছিল। এমন কোনো চিকিত্সক পাওয়া যাইবে না, ব্যক্তিগতভাবে যাহার নিকট থার্মোমিটার, স্টেথিস্কোপ ও ব্লাডপ্রেশার মাপিবার যন্ত্র নাই। সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিক বা অন্য কোনো স্বাস্থসেবা কেন্দ্রে সাধারণ এই জিনিসগুলি থাকিবে না, ভাবা যায় না। কিন্তু উল্লিখিত জরিপ হইতে জানা যায়, ৭৪ শতাংশ সরকারি চিকিত্সা কেন্দ্রে মৌলিক যন্ত্রপাতির কোনো না কোনোটির অভাব রহিয়াছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাগণ অবশ্য এই জরিপের ফলাফল যথার্থ বলিয়া মানিয়া নিতে নারাজ। কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের পরিচালক সহযোগী একটি দৈনিককে জানাইয়াছেন যে, সকল কমিউনিটি ক্লিনিকেই থার্মোমিটার এবং ওজন মাপার যন্ত্র আছে। বিদ্যুত্ আছে শতকরা ৫০ ভাগ ক্লিনিকে। দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার এই দাবি হয়তো অমূলক নহে। তবে, জরিপ ফলাফল কেন ভিন্ন কথা বলিতেছে, তাহাও তলাইয়া দেখা প্রয়োজন। এমন ঘটনাও বিচিত্র নহে যে, প্রতিটি ক্লিনিকের জন্য প্রাথমিক চিকিত্সা সরঞ্জামাদি হয়তো সরবরাহ করা হইয়াছে ঠিকই। কিন্তু সরবরাহকৃত জিনিস জায়গামত পৌঁছাইয়াছে কিনা, সেই প্রশ্নটিরও জবাব খুঁজিয়া নেওয়া দরকার।
সরকারি হাসপাতালের ঔষধ ও সরঞ্জামাদি বেহাত হইয়া যাওয়ার কোনো দৃষ্টান্ত নাই, বিষয়টি তো তেমন নহে। কাজেই এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু অনুসন্ধান প্রয়োজন বলিয়া আমরা মনে করি। অনিয়ম থাকিলে তাহা অবশ্যই দূর করিতে হইবে। গ্রামের চিকিত্সাকেন্দ্রে শহরের স্বয়ংসম্পূর্ণ হাসপাতালের মত সব ব্যবস্থা থাকিবে, এমনটি কেহ আশা করেন না। কিন্তু প্রাথমিক এবং মৌলিক সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পল্লী অঞ্চলে যে ক্লিনিক স্থাপন করা হইয়াছে, সেখানে প্রাথমিক চিকিত্সা সামগ্রীর যোগান ও ব্যবহার অবশ্যই নিশ্চিত করিতে হইবে।
