কি ঘটেছিল সোহাগপুরে

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৫, ১৬:৪৮
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নিভৃতপল্লীর নাম সোহাগপুর গ্রাম। একাত্তরের ২৫ জুলাই সকালবেলা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সোহাগপুর গ্রামে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষ মানুষকে নির্মমভাবে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। সম্ভ্রমহানি করে ১৪ নারীর।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়েছে এমন একটি সংবাদের ভিত্তিতে হানাদার বাহিনী রাজাকারদের সহায়তায় সোহাগপুর গ্রামের প্রফুল্ল­র দীঘি থেকে সাধুর আশ্রম পর্যন্ত এলাকা ঘিরে ফেলে। তিন-চার ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালিয়ে খুঁজতে থাকে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের আশ্রয়দাতাদের। এ সময় প্রাণের মায়া ত্যাগ করে এগিয়ে আসেন আলী হোসেন ও জমির আলী। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারেননি তারা। এক রাজাকার গুলি করে ওই দু’জনকেই হত্যা করে। শুরু হয় নারকীয় তাণ্ডব। মাঠে কর্মরত রমেন রিছিল, চটপাথাং, সিরিল গাব্রিয়েল নামে তিন আদিবাসী গারোকেও হত্যা করা হয়। এরপর একে একে হত্যা করা হয় আনসার আলী, লতিফ মিয়া, ছফর উদ্দিন, শহর আলী, হযরত আলী, রিয়াজ আহমেদ, রহম আলী, সাহেব আলী, বাবর আলী, উমেদ আলী, আছমত আলী, মহেজ উদ্দিন, সিরাজ আলী, আবুল হোসেনসহ ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষ মানুষকে।
 
সেদিন সকালে গ্রামের মানুষ লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে ক্ষেতে রোপা আমন লাগানোর জন্য যাচ্ছিলেন। কেউ কেউ কাজ করছিলেন বাড়িতেই। সিরাজ আলী বসেছিলেন ক্ষেতের আইলে। হঠাত্ গুলির শব্দে চমকে উঠে তাকিয়ে দেখেন বিলের ভিতর থেকে এগিয়ে আসছে ঘাতক হানাদার বাহিনী। ভয়ে সবাই দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাইলেও হাসান আলী বললেন, তোমরা যার যার কাজ কর দৌড়ালেই বরং গুলি করবে। কথা শেষ হতে না হতে মুহূর্তেই হানাদার বাহিনী কিশোর সিরাজ আলী ছাড়া সবাইকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। সেদিন লাশ হলো সবাই, রক্তে লাল হলো আমন ধানের ক্ষেত। আস্তে আস্তে সবাই লুটিয়ে পড়ল সোহাগপুরের মাটিতে। 
 
বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়, পাঁচটি গুলি লাগার পরও মুমূর্ষু অবস্থায় পড়েছিল রহম আলীর ছেলে সিরাজুল ও নাম না জানা অপর একজন। তাদের আর্তনাদ থামছে না দেখে নির্দয় হানাদার বাহিনীর একজন ধারালো বেয়নেট দিয়ে আঘাত করায় চিরতরে থেমে গেলেন তারা। ভীত শমসের আলী ও ছেলে হযরত আলী মাঠ থেকে দৌড়ে এসে ভয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ঘরে। হানাদার বাহিনী তাদেরকে ঘর থেকে আনতে গেলে স্ত্রী লাকজান বেগম হানাদার বাহিনীর পায়ে লুটিয়ে পড়ে স্বামী ও সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চান। লাকজান বেগমকে পাকবাহিনী বুট দিয়ে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দিয়ে শমসের আলীকে ধরে আনে। ভয়ে কাঁপছিল তার   দেহ! স্ত্রীর সামনেই গুলিতে ঝাঁজরা করে দিল শমসের আলীর দেহ। একইভাবে হত্যা করা হলো তার ছেলেকেও। এভাবে সোহাগপুর গ্রামের সকল পুরুষ মানুষকে হত্যা করা হয়। পরে এ গ্রামের নাম হয় বিধবা পাড়া। এখানে কলাপাতা, ছেঁড়া শাড়ি আর মশারি দিয়ে কাফন পরিয়ে চার থেকে পাঁচটি করে লাশ এক একটি কবরে দাফন করা হয়েছিল। আবার কোনো কোনো কবরে সাত থেকে আটটি করে লাশও এক সঙ্গে কবর দেয়া হয়েছিল। সেদিন স্বজন হারানোর গগন বিদারী চিত্কারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের জীবন্ত সাক্ষী রয়েছেন অনেকেই। মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনজন বিধবা, আর একজন শহীদ পরিবারের ছেলে। তাদের সাক্ষীতে কামারুজ্জামানের আজ ফাঁসি।