আচরণবিধি তোয়াক্কা করছেন না তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীরা। প্রতীক বরাদ্দের পর বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা আরো বেড়েছে। নগরীর পাড়া-মহল্লায় মিছিলে দেয়া হচ্ছে দলীয় শ্লোগান। মাইকের ব্যাপারে সুর্নিদিষ্ট নীতিমালা থাকলেও মানা হচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্মকর্তাদের সামনেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অথচ আইনে আচরণ বিধি লঙ্ঘনে জেল-জরিমানা ছাড়াও প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে ইসির। বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় শোকজ নোটিসকে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসাবে দেখছেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। আর ইসির এই ‘শোকজ ব্যবস্থা’র কারণে আচরণ বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন প্রার্থীরা।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য কমিশনের পাশাপাশির প্রার্থীদের অনেক ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতেই আচরণবিধি মেনে চলার জন্য সবাইকে আহ্বান জানান হয়েছে। প্রার্থীদের আইন মানতে বাধ্য করতে ইসি তার সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরপরও প্রার্থীরা আইন অমান্য করা শুরু করলে নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত হতে বাধ্য। তখন কমিশনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
তিন রিটার্নিং কর্মকর্তা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুই-একটি ক্ষেত্রে শোকজ করা হলেও নামকাওয়াস্তে জবাব দিয়েই পার পেয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। দুই-একজন কাউন্সিলর প্রার্থীকে জরিমানা করা হলেও সচেতন হননি অন্য প্রার্থীরা। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করার অভিযোগে ইতিমধ্যে দেড় শতাধিক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রায় শতাধিক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়। উত্তরে প্রায় ৩৫ জন প্রার্থীকে শোকজ নোটিস দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীকে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে শোকজ করা হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এসেছে কমিশনে।
এদিকে, গত শুক্রবার ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ১ হাজার ১৬৮ জন মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রতীক পাওয়ার পরপরই সাদা-কালো পোস্টারে ছেয়ে গেছে। অনেক জায়গায় রঙ্গিন পোস্টারও শোভা পাচ্ছে। কিছু কিছু এলাকায় পোস্টার দেয়ালেও সাঁটানো হচ্ছে। তবে আইন-বিধি লংঘনের ক্ষেত্রে মেয়র প্রার্থীদের চেয়ে কাউন্সিলর প্রার্থী এগিয়ে রয়েছে। আচরণ বিধি লঙ্ঘন ঠেকাতে প্রতীক বরাদ্দের পর তিন সিটির প্রতিটিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য কমিশন ৬ জন করে ১৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করেছে। তবে নির্বাচনী মাঠে তাদের কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিদিন দিনে সাত ঘণ্টা মাইক ব্যবহার করতে পারবেন প্রার্থীরা। ওয়ার্ড প্রতি সর্বোচ্চ দুইটি মাইক ব্যবহার করা যাবে; কিন্তু তিন সিটির বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, সকাল থেকে কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে মাইকিং করে ভোট প্রার্থনা করা হয়। রাত ১০টার পরও নগরীতে মাইক ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে অধিকাংশ প্রার্থী, তার কর্মী ও সমর্থকরা এখনো মাইক ব্যবহারের নিয়ম-নীতি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান।
আচরণ বিধিমালায় মিছিল ও দলীয় শ্লোগান নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানছেন না প্রার্থীরা। দলীয় প্রধানের নামে শ্লোগান চলছে অলিগলিতে। আবার কোথাও প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে মিছিল করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তরের কয়েকটি ওয়ার্ডে এসব ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরের রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহ আলম ইত্তেফাককে বলেন, আচরণ বিধির বাইরে কোন ঘটনা ঘটলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। দুই-একজন প্রার্থীর কারণে নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত হোক তা কেউ চায় না। তাই প্রয়োজনে আচরণ বিধি লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে মাইক ব্যবহার করতে দেখা যায় প্রার্থীদের। পাশাপাশি দল মনোনীত প্রার্থীর নাম উল্লেখ করে দলীয় প্রধানের নামে শ্লোগান দেন প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা। চট্টগ্রাম সিটিতে একই অবস্থা বিরাজ করছে। বিধিমালা অনুযায়ী উস্কানিমূলক বক্তব্যের পাশাপাশি ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন না প্রার্থীরা। দেয়াল লিখন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। প্রচারণায় পথসভা ও ঘরোয়া সভা ছাড়া কোনো জনসভা বা শোভাযাত্রা করা যাবে না। সড়ক আটকে মঞ্চ তৈরি ও পথসভা করা যাবে না।
এছাড়া আলোকসজ্জা, প্যান্ডেল, সড়কে নির্বাচনী ক্যাম্প, কোনো গেইট ও তোরণ নির্মাণেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে; কিন্তু আচরণ বিধি অনুসরণ না করে কিছু মেয়র ও অধিকাংশ কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতীক নিয়ে প্রচারণা শুরু করেছেন। এতে নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে বলে অভিযোগ আসছে কমিশনেও।
উল্লেখ্য, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিতের বিধান রয়েছে। প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
