ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আব্দ-রাব্বু মনসুর হাদি মিসরে পালিয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরব জোট দেশটিতে বেশ জোরালোভাবে বিমান হামলা চালালেও এখন পর্যন্ত তেমন কার্যকরী কোন সাফল্য পায়নি তারা। বিমান হামলার প্রথমদিকে এডেনসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় হুতি বিদ্রোহীরা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে নিজেদের পুনর্গঠিত করছে তারা। ফলে তিন সপ্তাহের ধারাবাহিক আক্রমণেও ইয়েমেন পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে গেছে।
আরব জোটের অভিযানের প্রথমদিকে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেয়া হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। দেশটির উত্তরাঞ্চলে হুতি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও বিমান হামলা চালানো হয়। বিমান হামলার কারণে বর্তমানে হুতি বিদ্রোহীরা দেশটির পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা পূর্বাঞ্চলের সুন্নি শাবওয়া প্রদেশের রাজধানীর দখল নিয়েছে। জোট বাহিনীর বিমান হামলার মুখেও প্রাদেশিক রাজধানী আতাকে প্রবেশ করে স্থানীয় সরকারের কার্যালয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কম্পাউন্ডগুলো দখলে নিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। এই প্রথম আতাক শহরটিতে প্রবেশ করেছে হুতিরা। আর আতাকে হুতিদের একপ্রকার সাদরেই গ্রহণ করেছে স্থানীয় আদিবাসী নেতা ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। অন্যদিকে জোটবাহিনী দাবি করছে, এডেনের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা তাদের হাতেই। হুতিদের সরবরাহ পথ এবং অস্ত্রাগার ধ্বংস করে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করার দাবি করেছে তারা। তবে কার্যত এডেনের লড়াইয়েও সুবিধাজনক অবস্থানে বিদ্রোহীরা।
হুতি বিদ্রোহী ও ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহর অনুসারীরা প্রাদেশিক রাজধানী আতাকে প্রবেশ করায় নতুন আরেকটা আশঙ্কা দেখা দিয়েছে সেখানকার মানুষের মনে। আতাকে প্রবেশের মধ্যদিয়ে তারা দেশটির অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত বেলহাফের প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি টার্মিনালের কাছে পৌঁছে গেছে। হুতি বিদ্রোহীরা এই গ্যাস টার্মিনাল দখল কিংবা কোন কারণে সেখানে নাশকতা চালালে তা দেশটির অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে।
চারটি উপসাগরীয় আরব দেশ যৌথভাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোটের সাথে বিমান হামলায় কাজ করে যাচ্ছে। সুন্নি প্রধান পাকিস্তানও আরব জোটের অভিযানের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। তবে তারা সরাসরি অভিযানে অংশ নিচ্ছে না। তিন সপ্তাহের বিমান হামলায় হুতি বিদ্রোহীরা ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদির বশ্যতা স্বীকার না করায় এখন অনেকেই স্থলযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন। তবে আরব জোট যদি ইয়েমেনে স্থলসেনা পাঠায় সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে পারে। সৌদি আরব স্থলসেনা পাঠালে তাতে আসলে রাজনৈতিকভাবে কে বেশি লাভবান হবে সেটা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে স্থলসেনা পাঠানোর মধ্যদিয়ে নিজ দেশে বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজের সমর্থন বাড়বে। আবার অনেকে মনে করছেন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট মানসুর হাদি তার হারানো ক্ষমতা ফিরে পেতে পারেন এই যুদ্ধে জয়লাভের মধ্যদিয়ে। তবে সবচেয়ে জটিল অঙ্ক হলো- সৌদি আরব স্থলসেনা পাঠালে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে হুতি বিদ্রোহীরা। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসা জনবিচ্ছিন্ন হুতি বিদ্রোহীরা জনগণের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। কারণ প্রেসিডেন্ট মানসুর হাদি নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে না পেরে জনগণকে ফেলে রেখে সৌদির সহযোগিতায় কোনরকমে দেশত্যাগ করেছেন। ক্ষমতা পুনর্দখল করতে তিনি আরব জোটকে দিয়ে ইয়েমেনে হামলা চালানোর পথ তৈরি করেছেন। এতে হুতি বিদ্রোহীরা মারা গেলেও অনেকক্ষেত্রেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আর হুতি বিদ্রোহীরা সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরব জোটের বিরুদ্ধে স্থলসেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করলে জনগণ হুতিদের পতাকাতলে যে এসে দাঁড়াবে না তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ইয়েমেনে আরব জোট স্থলসেনা পাঠালে তারা কতটা সফলতা লাভ করবে সেটা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। কারণ ইয়েমেনের অধিকাংশ মানুষের কাছেই ব্যক্তিগত অস্ত্র রয়েছে। তাছাড়া নিজ দেশের ভূখণ্ডে তারা যে বাড়তি সুবিধা পাবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই সেখানে স্থলসেনা পাঠানোর আগে ইয়েমেনের ইতিহাস, সামাজিক কাঠামো এবং জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত আরব জোটের।
জাতিসংঘের হিসাব মতে, গত তিন সপ্তাহের বিমান হামলায় হুতি বিদ্রোহী ছাড়াও কয়েকশ’ সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে। এদের একটা বড় অংশ শিশু। এই কয়দিনে গৃহহীন হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। উদ্বাস্তু এসব মানুষের কাছে ত্রাণ পর্যন্ত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মানুষ। মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি ইয়েমেনে নতুন করে স্থলসেনা পাঠিয়ে শান্তি ফেরানো কঠিন। এটা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
