মুখোমুখি আমেরিকা ও কিউবা। হাতে হাত বারাক ওবামা ও রাউল কাস্ত্রোর। দীর্ঘ কয়েক দশকের ঠাণ্ডা যুদ্ধে ইতি টানার দিকে নিঃসন্দেহে বিশেষ ইঙ্গিতবাহী ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই মুহূর্ত। শনিবার পানামায় এক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সৌজন্যের এই আবহ ধরা পড়ল দু’দেশের মধ্যে। বিষয়টি তাই বিরাট ঘটনা হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমে। বরফ গলার বার্তা দিয়ে এদিন ওবামা বললেন, কিউবার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল আমেরিকা। দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য এগিয়ে নিয়ে যেতে বৈঠকেও বসবেন দুই প্রেসিডেন্ট।
সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত মিলেছিল আগেই। পানামার শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকেই দ্বি-পাক্ষিক বৈঠক করেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও কিউবার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ব্রুনো রডরিগেজ। এর আগে ১৯৫৯ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিকসনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ফিদেল কাস্ত্রোর। তারপর থেকে দু’বছরের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হতে শুরু করে ওয়াশিংটন ও হাভানার। বন্ধ হয়ে যায় দু’দেশের দূতাবাস। ওবামা-কাস্ত্রোর বৈঠকে সেই দূতাবাস খোলার ব্যাপারে কথা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সন্ত্রাসে সহযোগী দেশের যে তালিকা আমেরিকা ঠিক করেছে, সেখান থেকেও কিউবার নাম বাদ দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে ওয়াশিংটন।
কয়েকদিন ধরেই বিশ্ব কূটনীতিতে ঘুরে ফিরে আসছিল কিউবার নাম। বাতাসে চাউর হয়ে যায়, দ্রুতহারেই গলছে ওয়াশিংটন-হাভানার সম্পর্কের বরফ। কয়েক মাস আগে ওয়াশিংটনে বারাক ওবামা ঘোষণা করেছিলেন, কিউবার সঙ্গে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে আমেরিকা।
বুধবার পানামায় এক বিশেষ বৈঠকে দেখা হয় জন কেরি ও কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনোর মধ্যে। এই বৈঠকই চূড়ান্ত রূপ পেল রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে বারাক ওবামার সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। ইউরোপের বাস্ক বিচ্ছিন্নতাবাদী ও কলম্বিয়ার এফএআরসি জঙ্গিদের আশ্রয় ও অর্থসাহায্য দেয়ার অভিযোগে ১৯৮২ সালে আমেরিকার ‘সন্ত্রাস সহযোগী দেশের’ তালিকায় নাম ওঠে কিউবার। এই তালিকায় কিউবা ছাড়া নাম আছে সুদান, ইরান ও সিরিয়ার। পুরোনো শত্রুতার কথা ভুলে গিয়ে সত্যিই হয়তো কিউবার সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্ব শুরু করতে চাইছে আমেরিকা। সন্ত্রাসে সহযোগী দেশের তালিকা থেকে কিউবার নাম সরিয়ে দেয়ার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইতিমধ্যেই প্রেসিডেন্টের কাছে প্রস্তাব করেছে। মার্কিন সিনেটের এক সদস্য স্বীকার করেছেন, হোয়াইট হাউসে পররাষ্ট্র দপ্তরের এই প্রস্তাব এসেছে। তবে, ওবামা জামাইকা সফরে যাওয়ার জন্য এই প্রস্তাব নিয়ে তার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করে উঠতে পারেননি।
কিউবা নিয়ে গত কয়েক মাসে ওবামা যে ধরনের মন্তব্য করেছেন তাতে এই প্রস্তাব সহজেই প্রেসিডেন্টের অনুমোদন পাবে বলে ধারণা করছেন মার্কিন রাজনীতিবিদরা। পানামায় আমেরিকা ও কিউবার প্রাথমিক বৈঠক সফল হয়েছে বলে দাবি করেছে দু’পক্ষই। এবার সবাই তাকিয়ে রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে বারাক ওবামার আলোচনার দিকে। কিউবার বাসিন্দাদের আশা, এবার তারা নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
শুক্রবার দীর্ঘ সময় ধরে বিবদমান দেশ দুটির প্রধানদের এই করমর্দনকে অতীতকে পেছনে ফেলে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় পারস্পরিক প্রত্যয়ের প্রতীকী প্রকাশ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষরা। ওইদিন শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে করমর্দনের পর ওবামা ও কাস্ত্রো অন্য কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলেন। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা, উভয় দেশের প্রেসিডেন্টের পরনে ছিল গাঢ় রংয়ের স্যুট। ওবামা ও কাস্ত্রো আবার মিলিত হবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
পানামাতের অনুষ্ঠিত আমেরিকার দেশগুলোর এই শীর্ষ বৈঠকে কিউবা-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও শুক্রবার সকালে ওবামা বলেন, ‘সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু করলেও সরকারের সঙ্গে সরকারের পার্থক্য বিবেচনায় কিউবার সঙ্গেও আমাদের অনেক পার্থক্য থাকবে। যেমন আমেরিকানদের ভিতরে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে, যেমন আমরা আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় ভিন্নমত পোষণ করি।’ তবে ওবামা এও বলেছেন, অতীতের মতো ল্যাটিন আমেরিকার ওপর আর নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা চাপিয়ে দেবে না যুক্তরাষ্ট্র।
আমেরিকার দুই মহাদেশের সবগুলো দেশের এ শীর্ষ সম্মেলনে এবারই প্রথমবারের মতো উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার ৩৫টি দেশের মধ্যে সবগুলো যোগ দিয়েছে। গত শীর্ষ সম্মেলনে কিউবার অংশগ্রহণে আপত্তি জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, আর কিউবার ওপর আরোপ করে রাখা নিষেধাজ্ঞার জন্য সম্মেলনে সমালোচিত হয়েছিল দেশটি। এবারের সম্মেলনে সেই কিউবা-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ক সূচনার বিষয়টিই সম্মেলনের কেন্দ্রীয় মনযোগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
