তায়েকোয়ান্দোতে ব্ল্যাক বেল্ট। সাঁতার, জিমন্যাস্টিকস, ট্যাপ ড্যান্সিং, গাড়ি চালনা— এ সব কিছুতেই পুরস্কার জিতেছেন অসংখ্য। তবে এগুলো মিডিয়াতে ফলাও করে ছাপা হতো না, যদি অসাধারণ ও অত্যাশ্চর্য কোন কিছু না হতো।
হাত ছাড়াই (জন্ম থেকেই তাঁর দু’হাত নেই) তিনি এ কাজ করে দেখিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী শিরোনাম হয়েছেন আরও বেশি কিছু করে। হাত ছাড়াই পাইলটের লাইসেন্স অর্জনের বিরল সম্মানের অধিকারী তিনি। পুরুষরা যে কাজ করতে পারেননি, জেসিকা কক্স তা করে দেখিয়েছেন।
‘সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় এবং ভীতিহীনতা আমার মূলমন্ত্র ছিল এবং আমি বিশ্বাস করতাম যে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে হলে বাইরের হাতের কোন প্রয়োজন নেই আমার।’ এমনই বলছিলেন সদা উত্ফুল্ল জেসিকা। জীবনটাকে তিনি গ্রহণ করেছেন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হিসেবে।
মার্কিন নাগরিক জেসিকা ১১ বছর বয়স পর্যন্ত কৃত্রিম হাত লাগাতেন শরীরে। কিন্তু এতে দারুণ অস্বস্তিবোধ করতেন তিনি। যে কারণে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নকল হাত দুটিকে খুলে রেখে পা দুটিকেই হাতের মতো কাজে লাগানোর। খুব দ্রুতই পা দিয়ে খেতে শিখে গিয়েছিলেন জেসিকা। স্বাভাবিক জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজগুলোও শিখতে শুরু করেছিলেন আস্তে আস্তে এবং সবকিছুই পা দুটো দিয়ে। চুল আঁঁচড়ানো ও লেখার কাজটিও আয়ত্তে এসে গিয়েছিল খুব সহজেই।
শৈশবে পঙ্গুত্ব তাঁকে মোটেই কাবু করতে পারেনি। তবে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমুদে বালিকা জেসি অনেক কিছু করতে পারতেন না। দোলাই ছিল তার একমাত্র খেলা। মাংকি বারের মতো খেলাধুলার সামগ্রীগুলো ছিল তার জন্যে নিষিদ্ধ। এতে প্রথমে কিছুটা দমে গেলেও হতাশা পুরোপুরি ঘিরে ফেলতে পারেনি। মনে মনে তখনই পণ করে ফেলেছিলেন, তিনি হবেন ‘সুপারউম্যান’। যে কারণে পরবর্তীতে স্কুলের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে সে অংশ নিতেন। সুইমিং, জিমন্যাস্টিকস, ট্যাপ ড্যান্সিং— এগুলোর কিছুই বাদ রাখতেন না।
১১ বছর বয়সেই শুরু করেছিলেন তায়েকোয়ান্দো। ১৪ বছর বয়সেই ইন্টারন্যাশনাল তায়েকোয়ান্দো ফেডারেশন আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অর্জন করেছিলেন জীবনের প্রথম ব্ল্যাক বেল্ট। দ্বিতীয় ব্ল্যাক বেল্ট এসেছিল কলেজ প্রতিযোগিতায়।
জেসিকার বাবা-মা তাঁকে অবিশ্বাস্য রকমের সমর্থন যুগিয়েছেন। উত্সাহ যোগাতেন স্বাভাবিক বালিকাদের চেয়ে বেশি কিছু করার ব্যাপারে। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রী থাকা অবস্থায় নোট নিতেন পা দিয়ে। খুব বেশি না পারলেও প্রতি মিনিটে পঁচিশটি শব্দ লিখতে পারতেন। এমনকি ফ্লোরে রাখা কম্পিউটারে নিত্যদিন টাইপ করতেন। শিক্ষা, ক্রীড়া ও অন্যান্য কার্যক্রমে ভাল করার পর শিখে নিয়েছিলেন গাড়ি চালনা, তবে তা গাড়ির বিশেষ সংস্করণে।
২০০৬ সালে জেসিকা কক্স এক যুদ্ধ-বিমানের পাইলটের সংস্পর্শে আসলেন। নাম রবিন স্টোড্ডার্ড। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান রাইট ফ্লাইটের প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। রবিন জেসিকাকে সরাসরিই জিজ্ঞেস করেছিলেন, বিমান চালাতে চান কি-না। সত্যি বলতে, বিমানে চড়ার ব্যাপারেও ছোটকাল থেকে তাঁর মধ্যে ভীতি কাজ করত। সেজন্য রবিন স্টোড্ডার্ডকে প্রথমে সরাসরি না করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে অনুধাবন করলেন যে, ভীতিকে জয় করতে হবে। ফলশ্রুতিতে তিনি তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন।
রবিন জেসিকাকে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা বিমান চালনার পরেই তিনি এ ব্যাপারে অনুরক্ত হয়ে পড়েন। প্রথমে পেছনে বসে বিমান চালনা দেখতেন। কিন্তু স্বপ্ন ছিল একাই বিমান চালানোর। বিষয়টি ছিল নিঃসন্দেহে কঠিন। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তাঁকে এফএএ (ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেটর)-এর কাছ থেকে স্টুডেন্ট পাইলট সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করতে হয়েছিল। হাত না থাকায় তাঁকে পাত্তাই দেয়া হচ্ছিল না। বুঝতে পেরে বাবাকে নিয়ে গিয়েছিলেন পরীক্ষকের কাছে।
যাই হোক, পরীক্ষক তাঁর বাবাকে বলেছিলেন, অভিভাবক হয়ে সার্টিফিকেটে স্বাক্ষর দিতে। বাবা অফিস ছাড়ার পর পরীক্ষক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হাত ছাড়া তুমি কীভাবে বিমান চালাবে?’ কোন উত্তর দিতে না পারলেও অদৃশ্য কারণে সেদিন মন গলেছিল পরীক্ষকের। টানা চার বছর প্রশিক্ষণ নেয়ার পর তাঁর মনে হয়েছিল, এ কাজ কিছুতেই সম্ভব নয়। সে সুবাদে তাঁর পাইলটের সার্টিফিকেট অর্জনও সম্ভব হবে না। সবকিছু বুঝলেও বিমানের ডিজাইনের কারণে একা চালাতে পারছিলেন না।
প্রশিক্ষণ চালিয়ে গেলেও প্রায়ই অসহায় বোধ করতেন জেসিকা। আসলে তার জন্যে প্রয়োজন ছিল রাডারহীন একটি বিমান, যাতে কন্ট্রোল প্যানেল নিচে থাকে এবং সহজেই পা দিয়ে সেটির নাগাল পান। নির্দেশককে এটি বোঝানোর তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত বিমানের ব্যবস্থা করেছিলেন।
৭৪ ঘণ্টা অনুশীলনের পর তাঁকে একা বিমান চালানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে পূরণ হলো তাঁর স্বপ্ন। ৮৯ ঘণ্টা বিমান চালিয়েছিলেন ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া ও অ্যারিজোনার দুর্গম অঞ্চলের উপর দিয়ে। হাতছাড়া প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এয়ারপ্লেন চালানোর সার্টিফিকেটটি জোটে তাঁর কপালে। জেসিকা কক্স মনে করেন, পাইলট হয়ে শূন্যে ভাসলে হতবিহবল হওয়ার কিছুই নেই। তাঁর ভাষায়, ‘দৃঢ় থেকে মনে রাখতে হবে, তোমার ভাগ্য তোমার হাতে। যেটি আমার ক্ষেত্রে পায়ে।’
