অশুভ শক্তি রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে নববর্ষ উদযাপন

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৫, ০০:২৩
পহেলা বৈশাখে প্রভাতের আলো ফোটার সাথে সাথে উত্সবে মেতে উঠেছিল পুরো জাতি। শুভ সম্ভাবনার নতুন দিন আনবার প্রত্যাশায় প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতেছিল সবাই; কিন্তু পহেলা বৈশাখ জাতির জীবনে আসে দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে। অশুভ শক্তি, সহিংস রাজনীতি, দেশ ধ্বংসের চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে পালিত হলো এবারের নববর্ষ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গানে, গানে শুভ সম্ভাবনার প্রত্যাশায় আর অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে মানুষ। পাশাপাশি দেশের বিগত তিন মাসের সহিংসতা আর ধর্মরক্ষার নামে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প চলছে চারপাশে তারই প্রতিবাদ উঠে এলো চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায়।
 
ছায়ানট
 
পহেলা বৈশাখে নতুন বছরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠান। শুরু হয় বাঙালির বর্ষবরণ। সেতারে সুর-মূর্ছনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারকার আনুষ্ঠানিকতা। প্রতিবছরের মতো এবারো ছায়ানটে একটি বিশেষ বিষয়ের উপর নিজেদের আয়োজনটি সাজায়। যার মূল প্রতিপাত্য- ‘শান্তি, মানবতা ও মানুষের অধিকার’। এ বিষয়ের উপর ভিত্তি করে সঙ্গীত ও কবিতা পাঠের মাধ্যমে সম্প্রীতি ও শান্তির বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেন সকলে।
 
সুরের ধারা ও চ্যানেল আইয়ের বর্ষবরণ
 
‘সুন্দর হোক আগামী দেশ হোক মঙ্গলময়’ প্রত্যয় নিয়ে গানে গানে নববর্ষকে স্বাগত জানিয়েছে সুরের ধারা ও চ্যানেল আই। ‘হাজারও কণ্ঠে বর্ষবরণ ১৪২২’ শিরোনামে বর্ণিল এই উত্সবটি বসেছিল ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের উন্মুক্ত চত্বরে। মঙ্গলবার সকালে ‘এসো হে বৈশাখ’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এর পর সুরের ধারার সভাপতি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্বে হাজারও কণ্ঠে পরিবেশিত হয় পঞ্চকবি গানসহ দেশের গান। সমবেত সঙ্গীতের পাশাপাশি ছিল একক গানের পরিবেশনা।  
 
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বর্ষবরণ
 
বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করা হয় জোটের পক্ষ থেকে।
 
বাংলা একাডেমি
 
সকালে রবিরশ্মির শিল্পীদের পরিবেশনায় ও মহাদেব ঘোষের পরিচালনায় বর্ষবরণ সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে একাডেমির নজরুল মঞ্চে নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর ছিল একক বক্তৃতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং স্বরচিত ছড়া-কবিতা পাঠ। বাংলা নববর্ষ বিষয়ে একক বক্তৃতা করেন ইমেরিটাস প্রফেসর রফিকুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক  আনিসুজ্জামান। এর আগে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয় ১০ দিনের বৈশাখী মেলা ও বইয়ের আড়ং।
 
শিল্পকলা একাডেমি
 
একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে একটানা ১০ ঘণ্টা ছিল বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল বাউল গান, রায়বেশে নৃত্য, সঙযাত্রা, ধামাইল, যাত্রাপালা, অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী, নাচ, আবৃত্তি, পঞ্চকবির গান ও ১০টি নাটকের দলের  কোরিওগ্রাফি।
 
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
 
রাজধানীর বাসাবো বালুর মাঠে ছিল উদীচীর বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। শাহাদাত্ আলী খানের সরোদ বাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাদের আয়োজন। এরপর তিনটি দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন উদীচীর শিল্পীরা। তারা গেয়ে শোনান ‘এসো হে বৈশাখ’, ‘আমি তাকডুম তাকডুম বাজাই’ এবং ‘বাংলা আমার সরষে ইলিশ’। সারাদিনের আয়োজনে ছিল উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন শাখা সংসদের শিল্পীদের পরিবেশনা। আরো ছিল উদীচীর শিল্পীদের কণ্ঠে একক সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নৃত্য। অনুষ্ঠানস্থলে রাখা হয় মুড়ি-মুড়কি ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খাবার। ছিল নানা ধরনের বর্ণিল মুখোশ ও মাটির সরা। বিশেষ আকর্ষণ ছিল ভারতের লোকসঙ্গীত শিল্পী শুভেন্দু মাইতির লোক গান।
 
ঋষিজ
 
‘জাগো নব আনন্দে’ শ্লোগান ধারণ করে ভাসানী সড়কের (শিশুপার্কের সামনে) নারকেল বীথি চত্বরের এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী এ বছর বর্ষবরণ উত্সবের ৩৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্মাননা জানান দুজন বিশিষ্টজনকে। লোকসঙ্গীত পরিবেশন করে দোহার। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিবেশনা ছাড়াও অনুষ্ঠানমালা ছিল নাচ ও আবৃত্তি। উত্সবে সভাপতিত্ব করেন ঋষিজ সভাপতি ফকির আলমগীর।
 
জাতীয় প্রেসক্লাব
 
প্রেসক্লাবের আয়োজনে ছিল দেশ বরেণ্য শিল্পীদের একের পর এক লোকসঙ্গীত, লালনগীতি, ভাওয়াইয়া ও দেশি গানের পরিবেশনা। প্রেসক্লাব সদস্যদের ছেলে-মেয়েদের পরিবেশনায় ‘এসো হে বৈশাখ এসো’ গান দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এর আগে ক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ বর্ষবরণ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন।
 
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)
 
দেশবরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি তরুণ সাংস্কৃতিককর্মীদের পরিবেশনার সঙ্গে দেশিয় খাবারের অ্যাপায়নের এ আয়োজন করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। সঙ্গীত পরিবেশন করেন সেলিম চৌধুরী, কুদ্দুস বয়াতি ও তার দল, আরাফাত রহমান মিশু, কৌতুক অভিনেতা সৈয়দ মিজানুর রহমানসহ আরো অনেকেই। আবৃত্তি পরিবেশন করেন বাকশিল্পী মাহিদুল ইসলাম। সবশেষ আয়োজন ছিল শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় অ্যাক্রোবেটিক দলের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ডিআরইউয়ের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আজিজুল পারভেজ। এর আগে অনুষ্ঠানের সূচনা করে সংগঠনের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 
ঢাবির বাংলা বিভাগের আয়োজনে কলা ভবনের সামনে ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজন। বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. বেগম আকতার কামালের সভাপতিত্বে এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বাংলা বিভাগসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী শিল্পীরা বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নিয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে বর্ণাঢ্যময় করে তোলে। চারুকলা অনুষদে ছিল পুতুল নাচের আয়োজন।
 
সারগাম ললিতকলা একাডেমি
 
ধানমন্ডির লেকের পাড়ে একাডেমির আয়োজনে অংশ বর্ষকথনে অংশ নেন কৃষিবিদ ড. মির্জা জলিল, কবি নাসির আহমেদ, শঙ্কর সাঁওজাল, গীতিকবি হুমায়ুন খালিদ ও একাডেমির পরিচালক ড. জসীম উদ্দিন। এর আগে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন শাহীন সরদারের নেতৃত্বে একাডেমির শিল্পীদের পরিবেশনা। আরো ছিল ‘বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সাজো’ শীর্ষক শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা।
 
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
 
সেগুনবাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত মিলনায়তনে বাউল গান পরিবেশন করেন জালাল দেওয়ান ও তার দল। লায়লা হাসানের পরিচালনা সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যজন ও নটরাজ। দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয় মৈত্রী শিশু দল ও কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ। 
 
এফডিসি
 
বর্ণিল সাজে সেজেছিল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি)। বর্ষবরণে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিচালক সমিতি। অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন ও বাংলা সিনেমার মিষ্টি মেয়ে খ্যাত নায়িকা কবরী। ছিল বর্ণাঢ্য  শোভাযাত্রা  ও পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম। দিনভর চলে শিশুদের জন্য বিভিন্ন খেলা। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক পর্বে অংশ, বিকেলে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
 
কনসার্ট আয়োজনে রাতের ঢাকা মুখরিত
 
রাজধানী ও এর আশপাশ এলাকাজুড়ে ছিল বিভিন্ন কনসার্ট। ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে ছিল ‘পাওয়ার ক্যান্ডি বৈশাখী কনসার্ট’। এ কনসার্টে গান পরিবেশন করে ফিডব্যাক, চিরকূট, বাউল এক্সপ্রেস এবং জেমস ও নগর বাউল। রবীন্দ্র সরোবরে ‘আলোকিত বৈশাখ’ শিরোনামে কনসার্টের আয়োজন করে ব্লুজ কমিউনিকেশন্স। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ইয়াসমীন মুশতারী, সালাউদ্দিন আহমেদ, শামা রহমান, চন্দনা মজুমদার, কিরণ চন্দ্র রায় প্রমুখ। নৃত্য পরিবেশন করে বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টসের নৃত্যশিল্পী, মহাকাল নাট্যসম্প্রদায় ও উপজাতি নৃ-গোষ্ঠী। রমনা উদ্যানের জামতলায় দেশ টিভি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহযোগিতায় আয়োজন করে ‘বৈশাখী আনন্দ তুফান’ শীর্ষক বনসার্ট। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন জেমস, সোলস, বাপ্পা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস, ফিডব্যাক, বৃষ্টি মুত্সুদ্দী, নির্বাচিতা মুত্সুদ্দী, লুবনা লিমি ও বাংলাদেশ পুলিশ সাংস্কৃতিক পরিষদের শিল্পীরা। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে ‘আনন্দে মাতো বৈশাখে’ কনসার্টে অংশ নেয় লালন, শূন্য, অ্যাবাউট রাফা, মায়া নহর এবং বাংলাদেশি আইডল আরিফ ও তুরিন। বনানীর রাজউক মাঠে ‘ইফাদ বৈশাখী উত্সব ১৪২২’ কনসার্টে অংশ নেন মাইলস, অর্থহীন, ওয়ারফেজ, কোনাল, শফি মণ্ডল ও বুশরা। কলাবাগান মাঠে ‘মোজো  বৈশাখী উত্সব’ কনসার্টে গান পরিবেশন করে নগর বাউল, শিরোনামহীন, আর্টসেল, চিরকূট। রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ায় ফ্যান্টাসি কিংডমে ‘বাংলালিংক প্রিয়জন’ কনসার্টে অংশ নেয় ফিডব্যাক, সোলস, হূদয় খান, জুয়েল মোর্শেদ ও নওমী। নন্দন পার্কে ছিল কনসার্ট।
 

এছাড়াও বর্ষবরণের নানা আয়োজন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষিবিদ ইন্সটিটিউট, ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল একাডেমি, বাংলাদেশ নাগরিক সমাজ ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ ছাড়াও  রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেল সোনারগাঁও, র্যাডিসন, ওয়েস্টিন, ঢাকা রিজেন্সি, খাজানাসহ হোটেল- রেস্টুরেন্টেগুলোর উদ্যোগে উদযাপিত হয় নতুন বছরের উত্সব। ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব উদ্যোগেও ছিলো নানা আয়োজন।

অশুভ শক্তি রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে নববর্ষ উদযাপন
ইত্তেফাক রিপোর্ট
পহেলা বৈশাখে প্রভাতের আলো ফোটার সাথে সাথে উত্সবে মেতে উঠেছিল পুরো জাতি। শুভ সম্ভাবনার নতুন দিন আনবার প্রত্যাশায় প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতেছিল সবাই; কিন্তু পহেলা বৈশাখ জাতির জীবনে আসে দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে। অশুভ শক্তি, সহিংস রাজনীতি, দেশ ধ্বংসের চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে পালিত হলো এবারের নববর্ষ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গানে, গানে শুভ সম্ভাবনার প্রত্যাশায় আর অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে মানুষ। পাশাপাশি দেশের বিগত তিন মাসের সহিংসতা আর ধর্মরক্ষার নামে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প চলছে চারপাশে তারই প্রতিবাদ উঠে এলো চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায়।
 
ছায়ানট
 
পহেলা বৈশাখে নতুন বছরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠান। শুরু হয় বাঙালির বর্ষবরণ। সেতারে সুর-মূর্ছনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারকার আনুষ্ঠানিকতা। প্রতিবছরের মতো এবারো ছায়ানটে একটি বিশেষ বিষয়ের উপর নিজেদের আয়োজনটি সাজায়। যার মূল প্রতিপাত্য- ‘শান্তি, মানবতা ও মানুষের অধিকার’। এ বিষয়ের উপর ভিত্তি করে সঙ্গীত ও কবিতা পাঠের মাধ্যমে সম্প্রীতি ও শান্তির বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেন সকলে।
 
সুরের ধারা ও চ্যানেল আইয়ের বর্ষবরণ
 
‘সুন্দর হোক আগামী দেশ হোক মঙ্গলময়’ প্রত্যয় নিয়ে গানে গানে নববর্ষকে স্বাগত জানিয়েছে সুরের ধারা ও চ্যানেল আই। ‘হাজারও কণ্ঠে বর্ষবরণ ১৪২২’ শিরোনামে বর্ণিল এই উত্সবটি বসেছিল ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের উন্মুক্ত চত্বরে। মঙ্গলবার সকালে ‘এসো হে বৈশাখ’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এর পর সুরের ধারার সভাপতি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্বে হাজারও কণ্ঠে পরিবেশিত হয় পঞ্চকবি গানসহ দেশের গান। সমবেত সঙ্গীতের পাশাপাশি ছিল একক গানের পরিবেশনা।  
 
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বর্ষবরণ
 
বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করা হয় জোটের পক্ষ থেকে।
 
বাংলা একাডেমি
 
সকালে রবিরশ্মির শিল্পীদের পরিবেশনায় ও মহাদেব ঘোষের পরিচালনায় বর্ষবরণ সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে একাডেমির নজরুল মঞ্চে নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর ছিল একক বক্তৃতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং স্বরচিত ছড়া-কবিতা পাঠ। বাংলা নববর্ষ বিষয়ে একক বক্তৃতা করেন ইমেরিটাস প্রফেসর রফিকুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক  আনিসুজ্জামান। এর আগে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয় ১০ দিনের বৈশাখী মেলা ও বইয়ের আড়ং।
 
শিল্পকলা একাডেমি
 
একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে একটানা ১০ ঘণ্টা ছিল বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল বাউল গান, রায়বেশে নৃত্য, সঙযাত্রা, ধামাইল, যাত্রাপালা, অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী, নাচ, আবৃত্তি, পঞ্চকবির গান ও ১০টি নাটকের দলের  কোরিওগ্রাফি।
 
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
 
রাজধানীর বাসাবো বালুর মাঠে ছিল উদীচীর বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। শাহাদাত্ আলী খানের সরোদ বাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাদের আয়োজন। এরপর তিনটি দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন উদীচীর শিল্পীরা। তারা গেয়ে শোনান ‘এসো হে বৈশাখ’, ‘আমি তাকডুম তাকডুম বাজাই’ এবং ‘বাংলা আমার সরষে ইলিশ’। সারাদিনের আয়োজনে ছিল উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন শাখা সংসদের শিল্পীদের পরিবেশনা। আরো ছিল উদীচীর শিল্পীদের কণ্ঠে একক সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নৃত্য। অনুষ্ঠানস্থলে রাখা হয় মুড়ি-মুড়কি ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খাবার। ছিল নানা ধরনের বর্ণিল মুখোশ ও মাটির সরা। বিশেষ আকর্ষণ ছিল ভারতের লোকসঙ্গীত শিল্পী শুভেন্দু মাইতির লোক গান।
 
ঋষিজ
 
‘জাগো নব আনন্দে’ শ্লোগান ধারণ করে ভাসানী সড়কের (শিশুপার্কের সামনে) নারকেল বীথি চত্বরের এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী এ বছর বর্ষবরণ উত্সবের ৩৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্মাননা জানান দুজন বিশিষ্টজনকে। লোকসঙ্গীত পরিবেশন করে দোহার। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিবেশনা ছাড়াও অনুষ্ঠানমালা ছিল নাচ ও আবৃত্তি। উত্সবে সভাপতিত্ব করেন ঋষিজ সভাপতি ফকির আলমগীর।
 
জাতীয় প্রেসক্লাব
 
প্রেসক্লাবের আয়োজনে ছিল দেশ বরেণ্য শিল্পীদের একের পর এক লোকসঙ্গীত, লালনগীতি, ভাওয়াইয়া ও দেশি গানের পরিবেশনা। প্রেসক্লাব সদস্যদের ছেলে-মেয়েদের পরিবেশনায় ‘এসো হে বৈশাখ এসো’ গান দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এর আগে ক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ বর্ষবরণ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন।
 
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)
 
দেশবরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি তরুণ সাংস্কৃতিককর্মীদের পরিবেশনার সঙ্গে দেশিয় খাবারের অ্যাপায়নের এ আয়োজন করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। সঙ্গীত পরিবেশন করেন সেলিম চৌধুরী, কুদ্দুস বয়াতি ও তার দল, আরাফাত রহমান মিশু, কৌতুক অভিনেতা সৈয়দ মিজানুর রহমানসহ আরো অনেকেই। আবৃত্তি পরিবেশন করেন বাকশিল্পী মাহিদুল ইসলাম। সবশেষ আয়োজন ছিল শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় অ্যাক্রোবেটিক দলের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ডিআরইউয়ের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আজিজুল পারভেজ। এর আগে অনুষ্ঠানের সূচনা করে সংগঠনের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 
ঢাবির বাংলা বিভাগের আয়োজনে কলা ভবনের সামনে ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজন। বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. বেগম আকতার কামালের সভাপতিত্বে এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বাংলা বিভাগসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী শিল্পীরা বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নিয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে বর্ণাঢ্যময় করে তোলে। চারুকলা অনুষদে ছিল পুতুল নাচের আয়োজন।
 
সারগাম ললিতকলা একাডেমি
 
ধানমন্ডির লেকের পাড়ে একাডেমির আয়োজনে অংশ বর্ষকথনে অংশ নেন কৃষিবিদ ড. মির্জা জলিল, কবি নাসির আহমেদ, শঙ্কর সাঁওজাল, গীতিকবি হুমায়ুন খালিদ ও একাডেমির পরিচালক ড. জসীম উদ্দিন। এর আগে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন শাহীন সরদারের নেতৃত্বে একাডেমির শিল্পীদের পরিবেশনা। আরো ছিল ‘বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সাজো’ শীর্ষক শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা।
 
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
 
সেগুনবাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত মিলনায়তনে বাউল গান পরিবেশন করেন জালাল দেওয়ান ও তার দল। লায়লা হাসানের পরিচালনা সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যজন ও নটরাজ। দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয় মৈত্রী শিশু দল ও কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ। 
 
এফডিসি
 
বর্ণিল সাজে সেজেছিল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি)। বর্ষবরণে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিচালক সমিতি। অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন ও বাংলা সিনেমার মিষ্টি মেয়ে খ্যাত নায়িকা কবরী। ছিল বর্ণাঢ্য  শোভাযাত্রা  ও পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম। দিনভর চলে শিশুদের জন্য বিভিন্ন খেলা। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক পর্বে অংশ, বিকেলে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
 
কনসার্ট আয়োজনে রাতের ঢাকা মুখরিত
 
রাজধানী ও এর আশপাশ এলাকাজুড়ে ছিল বিভিন্ন কনসার্ট। ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে ছিল ‘পাওয়ার ক্যান্ডি বৈশাখী কনসার্ট’। এ কনসার্টে গান পরিবেশন করে ফিডব্যাক, চিরকূট, বাউল এক্সপ্রেস এবং জেমস ও নগর বাউল। রবীন্দ্র সরোবরে ‘আলোকিত বৈশাখ’ শিরোনামে কনসার্টের আয়োজন করে ব্লুজ কমিউনিকেশন্স। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ইয়াসমীন মুশতারী, সালাউদ্দিন আহমেদ, শামা রহমান, চন্দনা মজুমদার, কিরণ চন্দ্র রায় প্রমুখ। নৃত্য পরিবেশন করে বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টসের নৃত্যশিল্পী, মহাকাল নাট্যসম্প্রদায় ও উপজাতি নৃ-গোষ্ঠী। রমনা উদ্যানের জামতলায় দেশ টিভি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহযোগিতায় আয়োজন করে ‘বৈশাখী আনন্দ তুফান’ শীর্ষক বনসার্ট। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন জেমস, সোলস, বাপ্পা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস, ফিডব্যাক, বৃষ্টি মুত্সুদ্দী, নির্বাচিতা মুত্সুদ্দী, লুবনা লিমি ও বাংলাদেশ পুলিশ সাংস্কৃতিক পরিষদের শিল্পীরা। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে ‘আনন্দে মাতো বৈশাখে’ কনসার্টে অংশ নেয় লালন, শূন্য, অ্যাবাউট রাফা, মায়া নহর এবং বাংলাদেশি আইডল আরিফ ও তুরিন। বনানীর রাজউক মাঠে ‘ইফাদ বৈশাখী উত্সব ১৪২২’ কনসার্টে অংশ নেন মাইলস, অর্থহীন, ওয়ারফেজ, কোনাল, শফি মণ্ডল ও বুশরা। কলাবাগান মাঠে ‘মোজো  বৈশাখী উত্সব’ কনসার্টে গান পরিবেশন করে নগর বাউল, শিরোনামহীন, আর্টসেল, চিরকূট। রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ায় ফ্যান্টাসি কিংডমে ‘বাংলালিংক প্রিয়জন’ কনসার্টে অংশ নেয় ফিডব্যাক, সোলস, হূদয় খান, জুয়েল মোর্শেদ ও নওমী। নন্দন পার্কে ছিল কনসার্ট।
 

এছাড়াও বর্ষবরণের নানা আয়োজন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষিবিদ ইন্সটিটিউট, ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল একাডেমি, বাংলাদেশ নাগরিক সমাজ ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ ছাড়াও  রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেল সোনারগাঁও, র্যাডিসন, ওয়েস্টিন, ঢাকা রিজেন্সি, খাজানাসহ হোটেল- রেস্টুরেন্টেগুলোর উদ্যোগে উদযাপিত হয় নতুন বছরের উত্সব। ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব উদ্যোগেও ছিলো নানা আয়োজন।