অস্ত্র অপরাধী দমনে, পকেটে রাখতে নয়

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৫, ০০:২৬

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যার অভিযোগ খণ্ডন করে বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অস্ত্র দেয়া হয় অপরাধী দমনের জন্য, অস্ত্র পকেটে রেখে দেয়ার জন্য নয়। অপরাধীদের দমন করতেই হবে। তিনি বলেন, হরতাল-অবরোধের নামে তারা মানুষকে পুড়িয়ে মারছে, বাস ও রেলে আগুন দিচ্ছে, রেললাইন তুলে ফেলছে, মানুষ হত্যা করছে, আর সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে যে, ও আগুন দিচ্ছে ওকে কিছু করা যাবে না! আর কিছু করলেই মানবাধিকার লংঘন হয়ে যাবে! আর যারা পুড়ছে সেই মানুষগুলোরই বা কী অপরাধ?

 
গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে কলামিস্ট, লেখক, সঞ্চালক, টকশো’র আলোচকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শুভেচ্ছা বিনিময় ছাড়াও সূচনা বক্তব্য শেষে দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেন এবং তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হরতাল-অবরোধে যখন একের পর এক গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়, তখন সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে বরং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কেউ মারা পড়লে তার সমালোচনা করা হয়। অপরাধীরা যখন মারা গেছে, সেই অপরাধীদের জন্য কান্না! তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, একটা মানুষের জন্য যদি ৫০টা মানুষ বাঁচানো যায়, তো কোনটা সঠিক হবে? এই ৫০টা মানুষকে বাঁচানো নাকি ওই অপরাধীকে বাঁচিয়ে আরো ৫০ মানুষকে হত্যা করার সুযোগ করে দেয়া? তিনি বলেন, বলা হচ্ছে, ক্রসফায়ারে মানুষ মারা হচ্ছে। ক্রসফায়ার তো না। কেউ যখন অপরাধ করতে যায়, পুলিশের তো অধিকার আছে সেই মানুষের জানমাল বাঁচানো। আর সেটা বাঁচানোর জন্য তাদের যেটা করার তা তাদের করতে হবে। আমরা বাধ্য হয়েছি পুলিশকে সেই নির্দেশ দিতে।
 
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি রায় কার্যকর হয়েছে এবং বাকি সব রায়ও কার্যকর করা হবে। আর এ রায় বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কত উঁচু জায়গা থেকে টেলিফোন এসেছে এবং ফাঁসি যেন দেয়া না হয় সেই অনুরোধ পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে যত বাধাই আসুক, সবকিছু মোকাবেলা করেই এই বিচার আমরা শেষ করবোই ইনশাল্লাহ্।
 
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে জাতীয়-আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও কিছু ব্যক্তির ভূমিকার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে নির্যাতিত ও নিহতদের কথা না ভেবে তাদের যারা হত্যা, ধর্ষণ করেছে তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়। নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্তদের কথা না ভেবে যারা তাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে তাদের মানবাধিকার নিয়েই অনেকে সোচ্চার কেন? মানবাধিকারের কথা বলবো, কিন্তু মানবাধিকার যারা লংঘন করবে তাদের মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে নাকি? মানবাধিকার লংঘনকারীদের মানবাধিকার নিয়ে সবাই খুব ব্যস্ত। একটা অদ্ভুত বিষয় আমি সব সময় দেখি যে, অপরাধীদের জন্যই সবার মায়াকান্না।
 
মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষ ১৪২২ উপলক্ষে বিএনপির অনুষ্ঠানে লাল পেড়ে শাড়ি পরে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার যোগদানের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, নববর্ষ উদযাপন করতে গেলে অনেকেই বলেন এটি নাকি হিন্দুয়ানী উত্সব! লাল পেড়ে শাড়ি পরলে তারা বলেন লাল হিন্দুদের রং। কিন্তু গতকাল (মঙ্গলবার) টেলিভিশনে যা দেখেছি, তাতে খুশিই হয়েছি। এর চেয়ে বেশি বলার প্রয়োজন নেই। বুদ্ধিমানরা ইশারাতেই বুঝে নেবেন। তবে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সঙ্গে রং ও ধর্মের কী সম্পর্ক এটি জানা নেই।   
 
আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস-নৈরাজ্য ও মানুষ হত্যার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী নিজেই নিজেকে অবরুদ্ধ করে মানুষ হত্যা করলেন। এভাবে মানুষ হত্যা ও জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা সবচেয়ে জঘন্য ও বর্বর ঘটনা। আন্দোলনের নামে এ ধরনের বর্বরতা যেন আর না ঘটে সে আশাবাদও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
 
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বাংলা একাডেমির সভাপতি ও এমেরিটাস প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জামান খান, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী।
 
নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়
 
মঙ্গলবার সকালে গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও দলের সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের বলেন, পুড়িয়ে মানুষ মারার যে সংস্কৃতি বিএনপি শুরু করেছে, সামান্য মানবিকবোধ সম্পন্ন কোন মানুষ এমনটি করতে পারে না। একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে মানুষ পোড়ানোর রাজনীতির মতো নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে? অতীতে আমরা কখনোই আন্দোলনের নামে এভাবে মানুষকে পুড়িয়ে মারতে দেখিনি। রাজনীতিতে সহিংসতার যে ধারা সূচনা হয়েছিল দৃঢ়ভাবে তা প্রতিরোধ করায় দেশের সাধারণ জনগণকে অভিনন্দন জানান তিনি।
 
অনুষ্ঠানের শুরুতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ফুলের তোড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। দেশবাসীকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আন্দোলনের নামে সহিংসতা আর মানুষ হত্যার যে সংস্কৃতি চালু করেছিল বিএনপি, আগামীতে তা আর থাকবে না। নতুন বছরে রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ হবে, পুড়িয়ে মানুষ মারার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না এবং জনগণের জন্য শান্তি বয়ে আনবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে ৯২ দিন জনগণ জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছে। দেশের মানুষের উপর দিয়ে অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে। ৯২ দিন পর্যন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা, দেশের সম্পদ ধ্বংস করা, কোরআন শরীফ পোড়ানোসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত চক্র ট্রাক, বাস এবং ট্রেনে আগুন দিয়ে ধ্বংসাত্মক কাজ করে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি করেছে। তারা শুধুমাত্র পাবলিক গাড়ি পুড়িয়েছে তা নয়, তারা নিম্ন ও মধ্য এবং সাধারণ মানুষকেও পুড়িয়ে মেরেছে। তবে একটি ভালো দিক হচ্ছে, সাধারণ জনগণ এ ধরনের নৃশংস কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেছে। স্থানীয় জনগণ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে বিএনপি-জামায়াতের কর্মকাণ্ড রুখে দেয়ায় আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের কল্যাণ এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে কাজ করে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। আমরা চাই যে, এদেশের জনগণ আর আগুনে পুড়ে মরবে না। তারা শান্তিতে ও নিরাপত্তায় বসবাস করবে এবং দেশ আর্থ-সামাজিকভাবে এগিয়ে যাবে।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করে বিশ্বে একটি রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই যাত্রা শুভ হবে। জনগণের আশা ও প্রত্যাশা পূরণ হবে এবং তাদের জীবনে আরো বেশি উন্নতি হবে। তিনি বলেন, এটি আনন্দের বিষয় জনগণ ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠী নির্বিশেষে উত্সবমুখর পরিবেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করছে। সব জাতি ধর্মের মানুষকে নিয়ে বর্ষবরণের যে উত্সব, তা সার্বজনীন রূপ পেয়েছে বাংলাদেশে।
 

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, এইচ টি ইমাম, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ড. মশিউর রহমান, অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী, কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ, ড. হোসেন মনসুর, প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহারা খাতুন, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আহমদ হোসেন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম, ড. হাছান মাহমুদ, কামরুল ইসলাম, মুকুল বোস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।