সংসার আর সন্তান, এই নিয়েই বিগত বেশ কিছুদিন ব্যস্ত ছিলেন চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা। তবে আশার কথা হচ্ছে, পূর্ণিমা আবারও কাজে নিয়মিত হয়ে উঠবেন। আবারও তার চিরচেনা স্থানে তিনি নতুনরূপে নিজেকে তুলে ধরবেন। দর্শক তাদের ভালোবাসার প্রিয় পূর্ণিমাকে আবারও পর্দায় দেখতে পাবেন। বিস্তারিত লিখেছেন অভি মঈনুদ্দীন
রাজধানী নিকুঞ্জর নিরিবিলি এক বাড়িতে পূর্ণিমার দিন কিংবা রাত্রির আসা-যাওয়া। এই বাড়িতেই দিনে দিনে বেড়ে উঠছে তার একমাত্র কন্যা সন্তান আরশিয়া উমায়জা। দেখতে দেখতে পূর্ণিমার ঘর আলোকিত করা তার আদুরে কন্যা এক বছর পেরিয়ে দু’বছরে পা রেখেছে। চাঁদের আলোয় আলোকিত সন্তানের মুখ দেখে দেখেই যেন কেটেছে বিগত একটি বছর। তবে ছোট্ট বাবুটির মিষ্টি মিষ্টি দুষ্টুমিও এখন তার নিয়ন্ত্রণে। আর তাই হয়তো আসছে ঈদের পর তিনি কাজে ফেরারও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
যদি তাই হয় তবে উঁচু মাপের শিল্পী সংকটের এই মুহূর্তে হয়তো আশা জাগাবেন পূর্ণিমা আবারও যদি কাজে নিয়মিত হন। একটি সময়ে আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রে চার খুঁটির একটি ছিলেন পূর্ণিমা। টানা এক যুগেরও বেশি সময় এই চার খুঁটির উপরই দাঁড়িয়েছিল আমাদের চলচ্চিত্র। কিন্তু সেই চার জনের মধ্যে শাবনূর এবং পূর্ণিমা অনিয়মিত। আবার পপি মাঝে মাঝে কিছু কাজ করেন। মৌসুমীকেই এখনো ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে।
তবে যদি এই চারজনই আবারও কাজে নিয়মিত হন, তবে আশা করা যায় যুগোপযোগী গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হলে তা দেখতে অবশ্যই হলমুখী হবেন দর্শক। কারণ এখনো হলে হলে দর্শক খোঁজেন তাদের প্রিয় নায়িকা পূর্ণিমা কিংবা শাবনূরকে। চট্টগ্রামের মেয়ে দিলারা হানিফ রীতার (পূর্ণিমা) বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই।
জাকির হোসেন রাজুর ‘এ জীবন তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে রিয়াজের বিপরীতে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে ১৯৯৭ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে পূর্ণিমার। প্রথম চলচ্চিত্রেই চলচ্চিত্রের মধ্যমণিতে পরিণত হন তিনি। আগে চলচ্চিত্রে একটি রীতি ছিল, নায়ক-নায়িকাকে নতুন নামে দর্শকের সঙ্গে পরিচিত হতে হতো। সেই রীতির ধারাবাহিকতায় দিলারা হানিফ রীতাও হয়ে যান পূর্ণিমা। তার নামকরণ করেন মতিউর রহমান পানু। এরপর থেকে আজকের দিন পর্যন্ত সেই পূর্ণিমার আলো ছড়ানোর গল্প।
আহমেদ ফাহাদ জামালের সঙ্গে তার বিয়ে হয় ২০০৭ সালের ৪ নভেম্বর। সুখী এই দম্পতির ঘর আলোকিত করে গত বছরের ১৩ এপ্রিল রাত ১০টা ২০ মিনিটে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। যদিওবা পূর্ণিমার মা হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালের মে মাসে। তিনি বলেন, ‘আমাদের পারিবারিক ডাক্তার ডা. মজিবুর রহমান খান। তিনি পুরোনো ঢাকায় সালাউদ্দিন হসপিটালে বসেন। যে কারণে গত বছরের ১৩ এপ্রিল চেকআপ করাতে যাই সেখানে আমি আর আমার স্বামী। কিন্তু ডাক্তার চেকআপ করেই জানান দিলেন জরুরি ভিত্তিতে সিজারের মাধ্যমে সন্তানকে পৃথিবীর আলোর মুখ দেখাতে হবে। বিষয়টি যখন ফাহাদকে জানালাম তখন তিনিও বিশ্বাস করতে চাইলেন না। কিন্তু অবশেষে আল্লাহ যা ভালো, চাইলেন তাই হলো।
এখন আমার সন্তান ভালো আছে, সবাই দোয়া করবেন যেন সে সুস্থ থাকে, ভালো থাকে।’ পূর্ণিমা তার সন্তানের সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসার জন্য মহান আল্লাহর পর ডা. মুজিবর রহমান ও ডা. ইসমত বানুর কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। সন্তান নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও অবসরে চলচ্চিত্রের অতীত দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে তার। বিশেষ করে প্রয়াত নায়ক মান্নার সঙ্গে মজার মজার ঘটনার কথা খুব মনে পড়ে। সদ্য প্রয়াত চাষী নজরুল ইসলামের কথাও মনে পড়ে।
পূর্ণিমা চলচ্চিত্রে জুটিবদ্ধ হয়ে সবচেয়ে বেশি অভিনয় করেছেন মান্না ও রিয়াজের সঙ্গে। মান্নার সঙ্গে তার প্রথম চলচ্চিত্র ছিল এফ আই মানিকের ‘সুলতান’। সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল একই পরিচালকের ‘পিতা মাতার আমানত’। রিয়াজের সঙ্গে সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল সোহানুর রহমান সোহানের ‘লোভে পাপ পাপে মৃত্যু’।
এখন পর্যন্ত পূর্ণিমা অভিনীত আশিটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। তবে দর্শকপ্রিয় এই নায়িকার নিজের ভালোলাগার চলচ্চিত্র সালমান শাহ অভিনীত মালেক আফসারী পরিচালিত ‘এই ঘর এই সংসার’ এবং শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘পালাবি কোথায়’। নিজের অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে ভালো লাগে মতিউর রহমান পানুর ‘মনের মাঝে তুমি’। তবে অবসরে গান শুনতে ভালোলাগে এসএ হক অলিকের ‘হূদয়ের কথা’ চলচ্চিত্রের ‘ভালোবাসবো বাসবোরে বন্ধু তোমায় যতনে’ কিংবা ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’র ‘পৃথিবীর যত সুখ যত ভালোবাসা’ গানটি।
বর্তমান চলচ্চিত্র নিয়ে পূর্ণিমার অভিব্যক্তি ঠিক এমন, ‘ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে আমাদের এখানে। তবে সব চলচ্চিত্রেই যে মানসম্পন্ন তা নয়। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারটা সঠিকভাবে হচ্ছে না। যে কারণে অনেক চলচ্চিত্রই দেখলে মনে হয় টেলিফিল্ম হয়ে যাচ্ছে।’ পূর্ণিমার ইচ্ছে আছে নাটক কিংবা টেলিফিল্ম নির্মাণ করার। ইচ্ছে রয়েছে তার নিজের স্ক্রিপ্টের গল্প নিয়ে নির্মাণ করার। তবে সেটা হয়তো আরও কিছুটা সময় লাগবে।
১১ জুলাই জন্ম নেয়া পূর্ণিমা শুধু বড়পর্দাতেই নয় ছোটপর্দাতেও অনেক ভালো ভালো কাজ দর্শককে উপহার দিয়েছেন। রেজানুর রহমানের নির্দেশনায় শহীদুজ্জামান সেলিমের বিপরীতে একটি নাটকে তিনি প্রথম অভিনয় করেন। তবে মজার বিষয় হচ্ছে সালাহ উদ্দিন লাভলুর নির্দেশনায় নায়িকা হওয়ারও আগে তিনি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনে আংশিক মডেল হয়েছিলেন। হলে হলে একসময় পূর্ণিমা অভিনীত চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থাগুলোকে অর্থ ফিরিয়ে আনার গ্যারান্টি দিত। এখন ক’জন নায়িকাই বা সেই গ্যারান্টি দিতে পারে! তাই পূর্ণিমার মতো একজন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নায়িকার প্রত্যাবর্তনটা আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্যই মঙ্গলজনক। ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে পূর্ণিমার প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায়।
