খালেদা আক্তার কল্পনা। বাংলা চলচ্চিত্র কিংবা নাটকে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করা একজন সফল অভিনেত্রী। অভিনয়ের কারণে একসময় শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন তিনি। এদেশের দর্শকের কাছে মা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন অনন্য অসাধারণ অভিনেত্রী। তাকে নিয়ে লিখেছেন মিলান আফ্রিদী
এদেশের সিনেমা কিংবা নাটকে মায়ের চরিত্রে যাদের অভিনয় হয়ে উঠে জীবন্ত, তাদের অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেত্রী খালেদা আক্তার কল্পনা। জীবনে কোনোদিন অভিনেত্রী হবেন এটা তার কল্পনাতেও ছিল না। কিন্তু সেই কল্পনাকে ছাপিয়ে খালেদা আক্তার কল্পনা হয়ে উঠেছেন এদেশের দর্শকের প্রিয় একজন অভিনেত্রী। আমাদের দেশে নাটকের কিংবা চলচ্চিত্রের এমন অনেক পরিচালক আছেন, যারা মায়ের চরিত্রে খালেদা আক্তার কল্পনাকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। গুণী এই অভিনেত্রী এখনো নিরলসভাবে অভিনয় করে চলেছেন নাটক-চলচ্চিত্রে সমানতালে। শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে একসময় অভিনয়ে নাম লেখান খালেদা আক্তার কল্পনা। তবে সেই পেশায় ফিরেও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর একের পর এক চলচ্চিত্রে কাজ করায় আর শিক্ষকতায় ফেরা হয়নি তার। এখনো অভিনয়েই নিজেকে ব্যস্ত রাখেন দর্শকপ্রিয় এই অভিনেত্রী। গত বছর ঈদে খালেদা আক্তার কল্পনা পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেছিলেন। নাটকের নাম ‘সংসার যাপন’। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। কেমন সাড়া পেয়েছিলেন? জবাবে কল্পনা বলেন, ‘গল্পটি অনেক ভালো ছিল। সবাই বেশ আন্তরিকতা নিয়ে কাজটি করেছিলাম। আমি ভীষণ উপভোগ করেছিলাম আমার চরিত্রটি। নাটকের মূল গল্প বেশ ভালো ছিল। তাই প্রচারের পর আমি বেশ ভালো সাড়া পেয়েছি। আসলে ভালো কাজ হলে দর্শক এখনো নাটক দেখতে চান। কারণ সারাদিন কষ্টের পর দর্শক একটু বিনোদন চান। যারা নাটক নির্মাণ করেন, তারা যদি সেই বিনোদন দিতে পারেন তবেই তো দর্শক নাটক দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন।’ খালেদা আক্তার কল্পনা মূলত একজন চলচ্চিত্রাভিনেত্রী। চলচ্চিত্রেই কাজ করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এদিকে এখন পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন খালেদা আক্তার কল্পনা। তিনি সবচেয়ে বেশি অভিনয় করেছেন আবুল খায়ের বুলবুলের চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রে চিত্রনায়ক রুবেলের মা হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটক হচ্ছে ‘এম্পটি পকেট’, ‘ম্যান পাওয়ার’, ‘উড়ালপঙ্খী মন’, ‘সোনালু ফুল নীলাঞ্জনা’, ‘বায়ান্ন গলির এক গলি’, ‘পানিযুদ্ধ (একক), ‘রাবেয়া’, ‘নকশীকাঁথার মাঠ’ (টেলিফিল্ম), ‘বিন্দু নয় বৃত্ত’, ‘বনফুলের ঘ্রাণ’ ইত্যাদি। ১৯৮৪ সালে লন্ড্রি থেকে আনা কাপড়ের সঙ্গে একটি পত্রিকার কিছু অংশ পান তিনি। খেয়াল করে দেখেন তাতে এফডিসির নতুন মুখের খোঁজ নামে একটি বিজ্ঞাপন রয়েছে। কিছুটা কৌতূহল বশেই সেই ঠিকানা অনুযায়ী একটি দরখাস্ত পাঠিয়ে দেন। এরপর সে কথা তিনি ভুলেও যান। এর বেশ কিছুদিন পরে স্কুল ছুটি থাকায় তিনি ঢাকায় বেড়ানোর উদ্দেশে রওয়ানা হন। পথে দেখা হয় একসময় মঞ্চে একসঙ্গে অভিনয় করা বন্ধু পঙ্কজ বৈদ্যর সঙ্গে। তার অনুরোধে এফডিসিতে এলে তাকে তাত্ক্ষণিকভাবে একটি অভিনয় দেখাতে বলেন। তিনি তখন পাগল চরিত্রে অভিনয় করে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং পরবর্তীতে নতুন মুখের শিল্পী হিসেবে নির্বাচিত হন। এর কিছুদিন পর মিজানুর রহমানের ‘হনুমানের পাতাল বিজয়’ চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় করলেও তার অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র হচ্ছে মতিন রহমানের ‘রাধাকৃষ্ণ’। এরপর একে একে ‘সোহেল রানা’, ‘ফুলশয্যা’, ‘শেষ আঘাত’, ‘মায়ের কান্না’, ‘তিন কন্যা’, ‘রকি’, ‘ঢাকা-৮৬’, ‘জিনের বাদশা’, ‘অচেনা’, ‘অগ্নিসন্তান’, ‘চরম আঘাত’, ‘লোভ লালসা’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘সুজন’, ‘মাটির ফুল’, ‘গহীনে শব্দ’, ‘ভালোবাসা আজকাল’, ‘অস্ত্র ছাড়ো কলম ধরো’সহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করেছেন। অভিনয় জীবনের দীর্ঘ পঁচিশ বছরে তিনি এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচশ ছবিতে অভিনয় করেছেন। ৭ নভেম্বর জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রীর রয়েছে দু’সন্তান। নাম সেতু-বন্ধন। সেতু একজন ডাবিং শিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। তবে বর্তমানে তিনি লন্ডনে থাকেন। এই তো কিছুদিন আগে মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি দেশে এসেছিলেন। মেয়েকে কাছে পেয়ে ভীষণ খুশি ছিলেন খালেদা আক্তার কল্পনা। তার এই খুশি আজীবন অটুট থাকুক এই কামনা।
