এ অবস্থা সাময়িক। বড় দাগে পদোন্নতি দেয়ার প্রয়োজনেই এটা হয়েছে : সিনিয়র সচিব
ওএসডি ৩৭৩, সংযুক্ত ৩০৬, আর ন্যস্ত ১৩১ জন। পদোন্নতি পান ৮৭৩ জন।
প্রশাসনে বড় পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় সবার জন্য পদ জোগাড় করা যাচ্ছে না। তাই অনেককে ন্যস্ত, ওএসডি আর সংযুক্তি দিয়ে পদোন্নতিপূর্ব মন্ত্রণালয়ে (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে) অধস্তন পদে রাখা হচ্ছে। গত বুধবার পর্যন্ত হিসাবে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব মিলিয়ে ৩০৬ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত রাখা হয়েছে (এরা বেতন-ভাতা পাবেন না) ১৩১ জনকে আর ওএসডি তথা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসাবে আছেন ৩৭৩ জন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী অবশ্য বলছেন, ‘এ অবস্থা একেবারেই সাময়িক। এ বছরেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তা (বিভিন্ন স্তরের) অবসরে যাবেন। তখন পদগুলো শূন্য হবে সে ক্ষেত্রে ওএসডি, ন্যস্ত রাখা বা সংযুক্তির প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।’ তিনি বলেন, দুটি বড় ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিপ্রাপ্তি ছিল দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। এই প্রয়োজন মিটাতেই বড় ঝুঁকি নিয়ে বড় সংখ্যায় পদোন্নতি দেয়া হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে আর বড় কোনো সমস্যা না হয়। গত ৬ এপ্রিল ৮৭৩ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি দেয়া হয়। এসব কর্মকর্তার মধ্যে ৮১০ জনকে ন্যস্ত, না হয় ওএসডি কিংবা সংযুক্ত করা হয়েছে।
১৯৯২ সালের পর এটিই প্রশাসনে বড় পদোন্নতি। ১৯৯২ সালে ১৯৭৩ ব্যাচের অসংখ্য কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় প্রায় সাড়ে ১২শ’ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল। এবার অতিরিক্ত সচিব পদে ২৩১ জন যুগ্ম সচিব পদে ২৯৯ জন এবং উপসচিব পদে ৩৪৩ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। তিন স্তরে (উপসচিব-যুগ্ম, সচিব ও অতিরিক্ত সচিব) দেয়া এই পদোন্নতিতে প্রশাসনের সাংগঠনিক কাঠামোয় আরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ সংখ্যার তুলনায় অস্বাভাবিক সংখ্যায় কর্মকর্তার পদোন্নতি দেয়ায় এই চাপ তৈরি হলো। তারা বলছেন, পদোন্নতি প্রাপ্তদের সামাজিক মর্যাদা বাড়বে, কিছু আর্থিক সুবিধাও বাড়বে, কিন্তু তাদের প্রায় সকলকেই অধস্তন পদে থেকেই কাজ করতে হবে বেশ কিছু দিন।
যিনি অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন তিনি কাজ করছেন যুগ্ম সচিবের, যুগ্ম সচিব কাজ করছেন উপসচিবের আর উপসচিব কাজ করছেন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব তথা ডেস্ক অফিসারের পদে।
সর্বশেষ এই পদোন্নতির আগেই উপসচিব ৮৩০টি মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে ১ হাজার ৪৭৬ জন কর্মরত ছিলেন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮১৮ জন; যুগ্ম সচিবের ৪৩০টি পদে কর্মকর্তার সংখ্যা ৫৭০ জন থেকে বেড়ে এখন ৮৬৯ জন এবং অতিরিক্ত সচিবের ১০৭টি পদে কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ১৪২ জন; এখন তা বেড়ে ৩৭৩ জন হয়েছে।
প্রশাসনে পদ ভেদে দুই, তিন, চার বছর চাকরির অভিজ্ঞতা ও সমগ্র চাকরিজীবনের কর্মদক্ষতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে পদোন্নতি বিবেচনা করার কথা। প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনপ্রশাসন সংস্কারে স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকটি কমিশন বা কমিটি হয়েছে। কিন্তু এসব কমিশন বা কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। কিছু ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রকাশ করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে স্বাধীনতাপূর্ব সময় থেকে প্রশাসনের যে সাংগঠনিক কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) ছিল এখনো বস্তুত তাই আছে। মাঝখানে ১৯৮৩ সালে একসঙ্গে ৬৫০ জন, ১৯৮৪ সালে ৪৫০ জন, ১৯৮৫ সালে একই সঙ্গে ৫৫০ জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। তখনই প্রশাসন কাঠামোয় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। কিন্তু সে সময়ে কাঠামোতে কোনো সংস্কার না এনেই জোড়াতালি দিয়ে প্রশাসন চালানোর নীতি গ্রহণ করা হয় যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
অভিজ্ঞ মহল বলছে, বড় দাগে ওই নিয়োগের ধারাবাহিকতায় ধাপে ধাপে পদোন্নতি দেয়া হলেও আজকের সমস্যা এত প্রকট মনে হতো না। কিন্তু ১৯৯২ সালের পর প্রশাসনে মামলা-মোকদ্দমার জেরে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত পদোন্নতি কার্যত বন্ধই ছিল। ১৯৯৭ সালে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার মামলা-মোকদ্দমার পরিবর্তে কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে পদোন্নতির দ্বার খুলে দেয়।
কিন্তু ২০০১ সালের পর ২০০২ সালে পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় বেশিমাত্রায় নতুন উপসর্গ যোগ হয়। এ সময়ে গোপন এক নীতিমালা করে আরও ‘তথ্যের প্রয়োজন’ না হয় ‘জনতার মঞ্চের কর্মকর্তা’ এসব বিশেষণ লাগিয়ে পদোন্নতি বঞ্চিত রাখার প্রবণতা অস্বাভাবিক রূপ ধারণ করে। একই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সাল থেকেও কমবেশি কর্মকর্তাদের সরকার বিরোধী শিবিরের চিহ্নিত করে পদোন্নতি বঞ্চিত রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকে। ফলে পদোন্নতির দাবিদার কর্মকর্তার সংখ্য্যা ক্রমেই বেড়েছে। যার ধাক্কা সামলাতেই এবার প্রশাসনে নতুন এক নজির সৃষ্টি হলো সংযুক্তি।
ন্যস্ত বা ওএসডি রাখার সংস্কৃতি বেশ পুরনো। ওএসডি বা সংযুক্ত কর্মকর্তারা পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদে কাজ না করেও সরকারি সব আর্ির্থক সুযোগ-সুবিধা পাবেন কিন্তু দুর্ভাগ্য ন্যস্তওয়ালাদের। তারা না পাবেন বসার জায়গা, না পাবেন কোনো ধরনের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা। অবশ্য যখন পদ-পদবি পাবেন তখন বকেয়া হিসাবে সব সুবিধা পাবেন।
