রানা প্লাজা ধসে গার্মেন্টস নিরাপত্তা ইস্যু জোরদার

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৫, ১৩:৫৯

রানা প্লাজা ধসের পর গত দুই বছরে গার্মেন্টস খাতে কর্মপরিবেশের (কমপ্লায়েন্স) অগ্রগতির বিষয়টি এখন মূল আলোচনার বিষয়। ১ হাজার ১৩৮ শ্রমিকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ খাতের ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তায় কতটুকু অগ্রগতি হলো? দুই বছরকে সামনে রেখে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এমনকি বিশ্ব মিডিয়ার নজর এখানে।

 
কারখানা মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের প্রতিনিধিরাই স্বীকার করছেন, শ্রমিকের প্রতি মালিকপক্ষের মানোভাবের বড় পরিবর্তন এসেছে। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের উত্পাদনের অংশীদার হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন। বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের প্রতি মালিকদের মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার ক্ষেত্রে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান নেয়া হয়েছে। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের পরিদর্শনে এ পর্যন্ত ৩২টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এক্ষেত্রে বিজিএমইএ হস্তক্ষেপ করেনি। এমনকি বিজিএমইএ’র একজন পরিচালকের কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের পরিদর্শনকৃত কারখানার তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে প্রদর্শন করা হচ্ছে এফএফসি (ফেয়ার ফ্যাক্টরি ক্লিয়ারিং হাউজ) নামে। যে কোন ব্র্যান্ড এসব কারখানা সম্পর্কে তথ্য নিতে পারেন। বিশ্বের আর কোথাও এমন স্বচ্ছতা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। এরপরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, রাতারাতি সব সম্ভব নয়। এ জন্য সময় লাগবে। অবশ্য শ্রমিকপক্ষের দাবি, এই পরিবর্তন মূলত বিদেশি ব্র্যান্ড ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষের চাপে বাধ্য হয়ে।
 
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৩শ’ টাকা হয়েছে। ২০১৩ সালে শ্রম আইন সংশোধন হয়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনে কারখানার শ্রমিকদের অবাধে ট্রেড ইউনিয়ন করার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনে শ্রমিকদের জন্য আরো বেশকিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। প্রতিটি কারখানার শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। যদিও এ কাজটি সরকার না মালিকপক্ষের- এমন ঠেলাঠেলিতে তা ঝুলে রয়েছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। ২ শতাধিক কারখানা পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের পরিমাণ বেড়েছে। তবে রানা প্লাজার পর যে অগ্রগতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় তা হলো ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের উদ্যোগে কারখানা পরিদর্শন। ইউরোপিয় ইউনিয়ন, আইএলও ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয়েছে ‘সাসটেইন্যাবিলিটি কমপ্যাক্ট’। কারখানার সার্বিক পরিস্থিতি দেখভালের লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে জাতীয় ত্রি-পক্ষীয় কমিটি (এনটিপিএ)।
 
ক্ষতিগ্রস্তদের ৭০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ
 
আইএলও এবং ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়নের উদ্যোগে গঠিত রানা প্লাজা ট্রাস্ট ফান্ড থেকে এ পর্যন্ত নিহত শ্রমিকের পরিবার ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের ৭০ শতাংশ দেয়া হয়েছে। তবে ব্র্যান্ডগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থ না আসায় পুরো ক্ষতিপূরণে দেয়া সম্ভব হয়নি। কয়েক ধাপে এ অর্থ দেয়া হয়। সমপ্রতি ২৮শ’ জনকে ক্ষতিপূরণের ৩০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হয়। এর আগে কয়েক কিস্তিতে ৪০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। রানা প্লাজার আহত শ্রমিক ও নিহতদের পরিবার-পরিজন মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৫ হাজার সদস্য দাবিনামা পূরণ করেন। তাদের সবার জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এর মধ্যে যারা সুস্থ হয়েছেন তাদের বাদ দিয়ে ২ হাজার ৮শ’ জন (দাবিনামা অনুযায়ী) ক্ষতিপূরণের অর্থ পাচ্ছেন। সমন্বয় কমিটির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ হবে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা। ওই অর্থ নিহত শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের (সংখ্যার ভিত্তিতে) বন্টন করে দেয়া হচ্ছে। এ জন্য এখনো ৯০ লাখ ডলারের ঘাটতি আছে। দীর্ঘদিন ধরেই ক্রেতা ও ব্র্যান্ড তহবিলে কোন অর্থ দিচ্ছে না। কিছু ব্র্যান্ড অঙ্গীকার করলেও তারা অর্থ ছাড় করেনি। ক্ষতিপূরণের প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের জন্য ‘ক্লিন ক্লথ্স্ ক্যাম্পেইন’সহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক অধিকার সংগঠন সোচ্চার রয়েছে।
 
বেড়েছে ট্রেড ইউনিয়ন
 
রানা প্লাজা ধসের পর থেকে আন্তর্জাতিক চাপে শ্রম আইন সংশোধন করা হয় ২০১৩ সালে। সংশোধিত আইনে ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে কারখানায় ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা। দুই বছরে ২৯৮টি ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন পেয়েছে। আরো ৬১টি ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর আগে ১২ বছরে ট্রেড ইউনিয়ন ছিল মাত্র ১৩৮টি। তবে ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রে এখনো বাধা রয়েছে বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। তাদের অভিযোগ, গুরুত্বহীন কারণ দেখিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন আটকে দেন নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা (যুগ্ম শ্রম পরিচালক)। ট্রেড ইউনিয়নের জন্য স্বাক্ষরকারী শ্রমিকদের মালিকপক্ষের সামনে সাক্ষাত্কার বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ফলে অনেকে ভয়ে ট্রেড ইউনিয়নের কথা অস্বীকার করেন। তবে এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকরা চাইলে ট্রেড ইউনিয়ন হবে। না চাইলে জোর করে তো হবে না। তাদেরকে অবশ্যই আইনগত প্রক্রিয়ায় এগুতে হবে।
 
৩ হাজার টাকা থেকে মজুরি বেড়ে ৫৩০০ টাকা :
 
রানা প্লাজার পর বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের সবচেয়ে কম মজুরির বিষয়টি বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এরপর সরকার নতুন মজুরি কমিটি গঠন করে ৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বনিম্ন মজুরি ৫ হাজার ৩শ’ টাকা করে। তবে শ্রমিক নেতারা বলছেন, বর্ধিত বাড়িভাড়া, দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতি শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ বলেন, মজুরি টাকার অঙ্কে বাড়লেও প্রকৃত অর্থে বাড়েনি। শ্রমিকদের রক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির উদ্যোগ নিতে হবে। রেশন ব্যবস্থা, ডরমিটরির ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
 
অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের পরিদর্শন শেষে  চলছে কারখানার সংস্কার
 
রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক চাপে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে গঠিত হয় অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। এ দুটি জোট এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৭শ’ কারখানা পরিদর্শন করেছে। মূলত কারখানা ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক ত্রুটির বিষয়টি পরীক্ষা করে কী ধরনের সংশোধন কার্যক্রম চালাতে হবে তা তারা ঠিক করে দিচ্ছেন। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ৩২টি কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অন্য কারখানাগুলোকে ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় সংস্কারের পরিকল্পনা ঠিক করে দেয়া হয়েছে।
 
তবে এ দুটি জোটের পরিদর্শনের আওতার বাইরে থাকা কারখানাগুলোও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), সরকার ও মালিকপক্ষের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় ত্রিপক্ষীয় কমিটির (এনটিপিএ) উদ্যোগে পরিদর্শন করা হচ্ছে। অবশ্য কারখানা পরিদর্শন নিয়ে মালিকপক্ষ ও পরিদর্শক দলের মধ্যে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ চলছে। মালিকপক্ষ বলছেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডগুলো অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন তারা তা মানছেন না। অন্যদিকে তাদের কর্মপরিকল্পনার বাইরেও এখন নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন। তবে এতকিছুর পরও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রানা প্লাজা ধসের পর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি (শুল্কমুক্ত সুবিধা) স্থগিত করে। অবশ্য বাংলাদেশি পোশাক দেশটির বাজারে এ সুবিধা আগেও পেত না। পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য দেশটি বাংলাদেশকে ১৬টি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের শর্ত দেয়। এসব শর্তের বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডারের কাজটি এক বছর ধরে ঝুলে থাকা, শ্রম আইনের বিধি এখনো সম্পন্ন করতে না পারার মত বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোটা দাগে রয়ে গেছে।
 

রানা প্লাজা পরবর্তী গত দুই বছরের অগ্রগতি কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দেশিয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম অধিকার সংগঠন। জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন, ইউনি গ্লোবাল ইউনিয়ন, ক্লিন ক্লথস্ ক্যাম্পেইনসহ বেশকিছু সংগঠন রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ব্র্যান্ডদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে উদ্যোগী হয়েছে। ইন্ডাস্টিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ্র মনে করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো মালিকপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। ধীরে হলেও কমপ্লায়েন্সের অগ্রগতির বিষয়গুলো সঠিক পথেই এগুচ্ছে। তবে এ খাতের আমূল পরিবর্তনের জন্য ২ বছর সময় যথেষ্ট নয়। ৩০ বছরের পুঞ্জিভূত সমস্যার সমাধান ২ বছরে হয়ে যাবে- এমনটি আশা করা ঠিক হবে না। ১৯১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রায়াঙ্গল দুর্ঘটনার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, ওই অবস্থা থেকে সেখানে সহনীয় শিল্প এলাকা গড়ে তুলতে দেশটির ৫ বছর সময় লেগেছিল। বাংলাদেশেও শ্রমিকদের অগ্রগতির জন্য চারটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেন তিনি। এগুলো হলো— সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে পরিবেশ তৈরি করা, মালিকপক্ষ শ্রমিকদের উত্পাদনের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা, গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা এবং ব্র্যান্ডগুলোর পোশাকের উচিত মূল্য দেয়া।