সাকিব আলতো করে বলটা পুশ করলেন, একটা রান নিলেন। বাংলাদেশের সব খেলোয়াড় বেরিয়ে এলেন মাঠে। এটুকুই স্রেফ উদযাপন।
উদযাপন এমন সামান্য হলেও অসামান্য এক অর্জন হলো গতকাল মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে।
তামিম ইকবালের টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি, মুশফিকুর রহিমের ধ্বংসাত্মক ব্যাটিং ও বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ভর করে চলমান সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে পাকিস্তানকে ৭ উইকেটে হারালো বাংলাদেশ। পাকিস্তানের ছুঁড়ে দেওয়া ২৪০ রানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পৌঁছে গেলো ৭১ বল হাতে রেখে!
শুরু থেকেই বেশি আক্রমণাত্মক ছিলেন তামিম ও সৌম্য। জুনায়েদ খানের বলি হয়েছেন সৌম্য সরকার। ইনিংসের তৃতীয় ওভারে জুনায়েদ খানকে পরপর তিনটি বাউন্ডারি হাঁকান সৌম্য। এক বল বিরতি দিয়ে পরের বলটিও বাউন্ডারির জন্য খেলছিলেন। কিন্তু সোজা ব্যাটে খেলতে গিয়ে উইকেট কিপারের ক্যাচে পরিণত হন সৌম্য। সাজঘরে ফেরার আগে ১১ বলে ১৭ রান করে ফেরেন তিনি।
এদিনও সুবিধা করতে পারেননি মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করা রিয়াদ কাল ফিরেছেন ১৭ রানে। কিন্তু এরপরই শুরু হয়ে যায় আবারও তামিম ও মুশফিকের মহাকাব্যিক ব্যাটিং। আগের দিনের মতো বাংলাদেশের রেকর্ড করতে না পারলেও গতকালও দুজনে সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ করেছেন।
মুশফিকের আউটের ভেতর দিয়ে এই জুটি ভাঙার আগে বাংলাদেশের জয় তো একরকম নিশ্চিত হয়ে গেছেই; তৃতীয় উইকেটে যোগ হয়ে গেছে ১১৮ রান।
এর আগেই অবশ্য ইতিহাসে নাম লিখিয়ে ফেলেছেন তামিম ইকবাল। শাহরিয়ার নাফীস ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের পর মাত্র তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন।
দারুণ আক্রমণাত্মকভাবে শুরু করা তামিম ফিফটিতে পৌঁছে যান মাত্র ৩১ বলে। এরপর একটু ধীরেসুস্থে খেলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। তামিমের সেঞ্চুরি পূরণের পরপরই ফিরে যান বাংলাদেশের ‘রান মেশিন’ মুশফিকুর রহিম।
গতকালও ঝড়ের গতিতে ব্যাট করেছেন মুশফিক। ৭০ বলে ৮টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো ৬৫ রানের ইনিংস খেলে গেছেন মুশফিক।
তামিম অবশ্য হার মানলেন না। সেঞ্চুরির পর ট্রেডমার্ক এক ছক্কা মেরে নিজের প্রাণশক্তিটা বুঝিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত দলের জয় সঙ্গী করে তবেই যখন মাঠ ছাড়লেন, তামিমের রান তখন ১১৬ বলে ১১৬; ইনিংসে ১৭টি চার ও একটি ছক্কা।
এর আগে টস জিতে আগে ব্যাট করতে নামে পাকিস্তান ক্রিকেট দল। সরফরাজকে সঙ্গে নিয়ে শুরু থেকেই সতর্কতার সাথে খেলতে থাকেন আজহার আলী। পাকিস্তানের সংগ্রহ তখন সাত ওভারে ৩৬ রান। রুবেল হোসেন প্রথম স্পেলে বল করতে এসেই বাংলাদেশকে ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছেন। রুবেলের বলে ফাইন লেগে থাকা সৌম্য সরকারের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হয়ে সাজঘরে ফেরেন সরফরাজ আহমেদ (৭)। উইকেটে এসে এখনও থিতু হতে পারেনি। তার মধ্যেই আরাফাত সানির করা বলটি একটু বাঁক খেয়ে মোহাম্মদ হাফিজের স্ট্যাম্প ভেঙ্গে দেয়। শূন্য রানেই ফিরতে হয় পাকিস্তানের এই সেরা ব্যাটসম্যানকে। ৩৭ রানে দুই উইকেট হারিয়ে রক্ষণাত্মক পাকিস্তান। এরপর সময়ের ব্যবধানে উইকেট পতন। ৭৭ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে পাকিস্তান।
ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে সাদ নাসিমকে সঙ্গে নিয়ে ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করেন হারিস সোহেল। এই জুটিতে তাদের করা ৭৭ রানের কল্যাণে ২০০ রানের গণ্ডি পার হওয়ার সাহস পায় পাকিস্তান। মাশরাফি বিন মুর্তজার শিকার হওয়ার আগে ৬১ বলে ৪৪ রান করে ফেরেন হারিস সোহেল। শেষ দিকে ওয়াহাব রিয়াজ ও সাদ নাসিমের করা অবিচ্ছিন্ন ৬৬ বলের ৮৫ রানের জুটিতে ২৩৯ রানের পুঁজি পায় পাকিস্তান। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৭৭ রান করেন সাদ নাসিম। ৪০ বলে ৫১ রান নিয়ে অপরাজিত থাকেন ওয়াহাব রিয়াজ। বাংলাদেশ দলের হয়ে দুই উইকেট নেন সাকিব আল হাসান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
পাকিস্তান রান বল ৪ ৬
আজহার আলী ক মুশফিক ব সাকিব আল হাসান ৩৬ ৬০ ৫ ০
সরফরাজ আহমেদ ক সৌম্য ব রুবেল হোসেন ৭ ১১ ০ ০
মোহাম্মদ হাফিজ ব আরাফাত সানি ০ ৬ ০ ০
হারিস সোহেল ক এন্ড ব মাশরাফি বিন মুর্তজা ৪৪ ৬১ ১ ১
ফাওয়াদ আলম ব নাসির হোসেন ০ ৬ ০ ০
মোহাম্মদ রিজওয়ান এলবিডব্লিউ ব সাকিব ১৩ ২২ ২ ০
সাদ নাসিম অপরাজিত ৭৭ ৯৬ ৬ ১
ওয়াহাব রিয়াজ অপরাজিত ৫১ ৪০ ৫ ২
অতিরিক্ত (বাই ২, লেগবাই ২, ওয়াইড ৫, নোবল ২) ১১
মোট (ছয় উইকেট, ৫০ ওভার) ২৩৯
উইকেট পতন: ১/৩৬ (সরফরাজ আহমেদ, ৭.১), ২/৩৭ (মোহাম্মদ হাফিজ, ৮.৬), ৩/৫৮ (আজহার আলী, ১৫.৩), ৪/৫৯ (ফাওয়াদ আলম, ১৬.৫), ৫/৭৭ (রিজওয়ান, ২১.৩), ৬/১৫৪ (হারিস সোহেল, ৩৮.৬)।
বোলিং: মাশরাফি বিন মুর্তজা ৮-০-৫২-১, তাসকিন আহমেদ ৮-১-৪১-০, আরাফাত সানি ১০-০-৪১-১, রুবেল হোসেন ৭-২-২৭-১, নাসির হোসেন ৫-০-১৭-১, সাকিব আল হাসান ১০-০-৫১-২, মাহমুদুল্লাহ ২-০-৬-০।
বাংলাদেশ রান বল ৪ ৬
তামিম ইকবাল অপরাজিত ১১৬ ১১৬ ১৭ ১
সৌম্য সরকার ক সরফরাজ ব জুনায়েদ খান ১৭ ১১ ৪ ০
মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ব সাঈদ আজমল ১৭ ২৮ ২ ০
মুশফিকুর রহিম ক ফাওয়াদ ব রাহাত আলী ৬৫ ৭০ ৮ ১
সাকিব আল হাসান অপরাজিত ৭ ৫ ১ ০
অতিরিক্ত (লেগবাই ২, ওয়াইড ১৫, নোবল ১) ১৮
মোট (তিন উইকেট, ৩৮.১ ওভার) ২৪০
উইকেট পতন: ১/২২ (সৌম্য সরকার, ২.৫), ২/১০০ (মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, ১৪.১), ৩/২১৮ (মুশফিকুর রহিম, ৩৬.২)।
বোলিং: জুনায়েদ খান ৯-০-৬১-১, রাহাত আলী ৭-০-৫৭-১, ওয়াহাব রিয়াজ ৮-০-৩৬-০, সাঈদ আজমল ৯.১-১-৪৯-১, আজহার আলী ৩-০-২০-০ সাদ নাসিম ২-০-১৫-০।
টস: পাকিস্তান
ফল: বাংলাদেশ সাত উইকেটে জয়ী
