নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, হাওয়াই মিঠাই

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৫, ০২:৩৭
আকাশে বাতাসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনী আমেজ। পাড়া-মহল্লা, রাস্তাঘাট সব সাদা-কালো পোস্টারে সয়লাব হয়ে আছে। যদিও আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় তকমায় হবার কথা কিন্তু কে শোনে কার কথা। নির্বাচন কমিশন প্রতিদিন চিত্কার করে কিছু বলার চেষ্টা করছে। তবে তাতে কর্ণপাত করার মতো সময় প্রার্থীদের আছে বলে মনে হয় না। দলীয়, বিদ্রোহী, স্বতন্ত্র নানা কিসিমের প্রার্থী। সবাই জেতার ব্যাপারে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। সবার একটাই কথা, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমিই পাস। ওয়ার্ড ভিত্তিক প্রতিটি এলাকা কমিশনার প্রার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকলেও এই মুহূর্তে মেয়র প্রার্থিগণই সব মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। সকাল থেকে রাত অবধি মেয়র প্রার্থিগণ ছুটে চলেছেন শহরের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত। ভবিষ্যতে হয়তো জীবনেও আর দেখা হবে না তাই এই সুযোগে ‘আম’ ভোটাররা হেভিওয়েট ‘জাম’ প্রার্থীদের সাথে হাত মিলিয়ে, গলাগলি করে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিচ্ছেন।
 
ভোট হবে ২৮ এপ্রিল। এখনো বেশ ক’দিন বাকি আছে। কিন্তু এরমধ্যে প্রায় সব প্রার্থীই তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টো ঘোষণা করে ফেলেছেন। শত শত প্রতিশ্রুতিতে ভরপুর এসব নির্বাচনী মেনিফেস্টো দেখে আমি তো খুবই আশাবাদী হয়ে উঠেছি। সবচেয়ে দুর্বল যে প্রার্থী তিনিও যদি পাস করেন তাহলেও শহরে যে আর কোনো সমস্যাই থাকবে না, এটা প্রায় নিশ্চিত। বিদ্যুত্, পানি, গ্যাস, রাস্তা সব সমাধান হয়ে যাবে। কারণ প্রার্থীরা বলছেন, সব সমস্যা চিহ্নিত হয়ে গেছে, এখন শুধু সমাধান করার পালা। আর একবার তাঁরা নির্বাচিত হলেই হলো, ব্যস্, সব সমাধান করে ফেলবেন। তাহলে আমাদের এখন কী করা উচিত? আমার তো মনে হয় চোখ বন্ধ করে সিল মারা উচিত। কারণ এই সুযোগ যদি হাতছাড়া হয়, তাহলে জনগণের সমূহ বিপদ।
 
এক প্রার্থী একদিন বললেন, কয়েক লাখ গাছ লাগিয়ে শহরের তাপমাত্রা কত ডিগ্রি যেন কমিয়ে ফেলবেন। তিনি অবশ্য বলেন নি, এরজন্য কতগুলো গাছ তিনি কাটবেন। কিংবা কত কোটি টাকা লোপাট হবে এই কর্মসূচিতে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঘিরে আজগুবি সব প্রতিশ্রুতির জোয়ার বইছে। আমার ধারণা, ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করেই এসব প্রতিশ্রুতি দিতে হচ্ছে প্রার্থীদেরকে। এ প্রসংগে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। বেশ কবছর আগের কথা। স্কুলের কাজে গ্রামের বাড়িতে গেছি। বিকেলের দিকে গ্রামের দোকানগুলোর সামনে বসে গল্প করছি। এসময় সেপথে যাচ্ছিলেন আমাদের প্রাক্তন এমপি। মানুষের জটলা দেখে তিনি গাড়ি থামিয়ে নামলেন। উপস্থিত লোকজনের সাথে হাত মেলালেন। এরই মধ্যে এমপির দলীয় অনুসারী অতি উত্সাহী একজন ছুটে এসে বললেন— বস, এখানে তো অনেক মানুষ উপস্থিত। আপনি কিছু একটা প্রতিশ্রুতি দেন। এমপি প্রথমে একটু হতবাক হলেন। কথা নেই বার্তা নেই কিসের প্রতিশ্রুতি দেবেন। বললেন, কোনো উপলক্ষ ছাড়া কিসের প্রতিশ্রুতি? দলীয় অনুসারীটি নাছোড়বান্দা। বললো, তাও একটা কিছু প্রতিশ্রুতি দেন। এমপি ভদ্রলোক তাচ্ছিল্যভরে ওর দিকে একটু তাকালেন। ঠিক আছে, আজ না, অন্য একদিন— বলেই ঘুরে গাড়িতে চড়ে ওনার পথে চললেন। এই হলো, আমাদের ভোটারদের অবস্থা। রাস্তায় হঠাত্ দেখা হলো নেতার সঙ্গে, অমনি বলে বসলো— কিছু একটা প্রতিশ্রুতি দেন। আমার ধারণা, এই মুহূর্তে ঢাকার মেয়র প্রার্থীরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তাও অনেকটা গ্রামে দেখা সেই প্রতিশ্রুতির মতোই। উত্সাহী সমর্থকদের পাল্লায় পড়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে দিতে হচ্ছে এসব প্রতিশ্রুতি। যারা দিচ্ছেন তারাও জানেন এগুলো সবই হাওয়াই মিঠাই। কিন্তু ভোটাররা প্রতিশ্রুতি না পেলে ভোট দেবে না। যেমন ভোটার তেমন প্রার্থী।
 
আমার খুবই ইচ্ছা বড় দলগুলোর মেয়র প্রার্থীদের কাছ থেকে অন্তত একটা প্রতিশ্রুতি আদায় করি। দিনশেষে ওদের মধ্য থেকেই তো কেউ একজন নির্বাচিত হবেন। আমার সন্দেহ এর বাইরে কিছু ভাবার মতো ভোটার বাংলাদেশে এখনো তৈরি হয়নি। আর ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম তো বাংলাদেশের বাইরে না। এই শহর দুটোয়ও যে খুব সচেতন ভোটার বাস করে তেমন লক্ষণও তো আমি দেখছি না। সারা পৃথিবীর মধ্যে ঢাকাকে বসবাস অযোগ্য শহরে পরিণত করেছে এখানে বসবাসকারী মানুষগুলোই তো। সেই মানুষরাই ভোটের সময় হঠাত্ খুব সচেতন হয়ে যাবে, তেমন ভাবাটা হুদাই।
 

তো যে কথাটা বলতে চাইছিলাম, তা হলো, মেয়র যিনি নির্বাচিত হউন, তিনি শহরের ফুটপাতগুলো হাঁটার উপযোগী করবেন, এই প্রতিশ্রুতি যিনি বাস্তবায়ন করবেন, আমার ভোট তাঁর মার্কায়ই যাবে। নির্বাচিত মেয়র আমার চাওয়াটি পূর্ণ করবেন, সেই দুরাশায় হা করে রইলাম।