সমাজে নারীর প্রতি যৌন হয়রানির অপরাধগুলোকে লঘুভাবে দেখা হচ্ছে। এ ধরনের মানসিকতার কারণে নারীরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারীর উপর হয়রানির বিষয়টি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। তাই নারীর প্রতি যৌন হয়রানি নিয়ন্ত্রণে আইনের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ জরুরি হয়ে পড়েছে।
বুধবার কারওয়ানবাজার দৈনিক ইত্তেফাক অডিটরিয়ামে পাক্ষিক অনন্যা আয়োজিত ‘নারীর জন্য নিরাপদ নগরী’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন পাক্ষিক অনন্যা’র সম্পাদক ও দৈনিক ইত্তেফাক-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন।
অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় আমি দারুণভাবে ক্ষুব্ধ। আমি মনে করি, দেশে শক্ত প্রশাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারত না। রাষ্ট্র যদি চাইতো তাহলে একটিও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটতো না।
তিনি বলেন, দেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু মানবিক গুণাবলিতে ধস নেমেছে। নৈতিক এ অবক্ষয়ের জন্য তিনি রাজনৈতিক সিস্টেমকে দায়ী করেন। তাঁর মতে, অপরাধী জানে যে সহসা তাদের শাস্তি হবে না; ফলে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।
সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভাসিটি’র উপাচার্য অধ্যাপক পারভীন হাসান আক্ষেপ করে বলেন, ৪০ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি; এখন মনে হচ্ছে সবকিছু বিফলে যাচ্ছে। বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু পাঠ্যবইয়ের উপর প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা শিক্ষার ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলো খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। নারী নির্যাতন বৃদ্ধির জন্য অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবও দায়ী বলে তিনি মনে করেন।
ইত্তেফাকএর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, একজন নারী যৌন হয়রানির শিকার হলে তার মনে যে ট্রমা বা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, তা সে কাউকে বোঝাতে পারে না। ওই নারী মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তা সমাজকে উপলব্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের নৈতিকতা শিক্ষার ক্ষেত্রেও গাফিলতি রয়েছে। মানুষের প্রতি মানুষের যে সম্মান, তা নষ্ট হচ্ছে। ধর্মান্ধতা আমাদের চেপে ধরেছে। এর জন্য প্রচলিত রাজনীতিও অনেকাংশে দায়ী বলে তিনি মনে করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, যে অপরাধগুলো করতে কোনো ধরনের অস্ত্র লাগে না সে ধরনের অপরাধ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পহেলা বৈশাখের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সাধারণ দর্শনার্থীসহ সকলকে স্ক্যানিং করে ক্যাম্পাস চত্বরে প্রবেশ করিয়েছে। তার পরও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তাই নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিকভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
দৈনিক সমকালের নির্বাহী সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি পহেলা বৈশাখের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, এটি কেবল নারী নির্যাতন হয়; এটি প্রগতিশীলতার প্রতি বড় আঘাত। এ ধরনের ঘটনাগুলো নারীর অগ্রগতির জন্য অন্তরায়। একাত্তর টিভির সাংবাদিক ফারজানা রূপা বলেন, পহেলা বৈশাখে যে ঘটনাটি ঘটেছিল, সেটা এক ধরনের সন্ত্রাসী হামলা। বাঙালি সংস্কৃতিতে নারীর যে স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তা বন্ধ করতেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনার পর নারীদের আরও সোচ্চার হতে হবে। তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রে নারীর উপর নির্যাতনের বিষয়টি সমাজ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিচ্ছে। এ কারণেও সমাজে এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন, দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত, আইনজীবী ফারিয়া হোসেন, এক্টিভিষ্ট নাহিদা সুলতানা, প্রকৌশলী তিষিয়া নাশতারান, লেখক আঁঁখি সিদ্দিকা, সাংবাদিক ফাতেমাতুজ জোহরা, সাংবাদিক বাশার খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস সানী, শিক্ষার্থী ইনজামুল হক, রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ।
