মুশফিকের শট বাউন্ডারি দড়ি স্পর্শ করার আগেই মাতাল হয়ে উঠলো গ্যালারি, মেতে উঠলো যেন সারা দেশ। এবার আর নীরব রইলেন না ক্রিকেটাররাও। মুশফিক দু’ হাত শূন্যে তুলে বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, তারা কী অর্জন করেছেন।
হ্যাঁ, আরেকটি ইতিহাস ছুঁয়েছে বাংলাদেশ; নতুন এক ইতিহাসও লিখেছে বাংলাদেশ।
গতকাল মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানকে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে ৮ উইকেটে হারানোর ভেতর দিয়ে দশমবারের মতো কোনো দলকে হোয়াইট ওয়াশ করলো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। পাকিস্তানের বিপক্ষে এই সিরিজেরই প্রথম ম্যাচে ১৬ বছর পর জয় পাওয়া বাংলাদেশ স্বভাবতই এই দলটির বিপক্ষে প্রথম হোয়াইট ওয়াশের আনন্দ পেলো।
বাংলাদেশি বোলারদের সমন্বিত আক্রমণের মুখে ভালো শুরু করার পরও ২৫০ রানে গুঁড়িয়ে যায় পাকিস্তান। জবাব দিতে নেমে তরুণ সৌম্য সরকারের প্রথম সেঞ্চুরি এবং তামিম ও মুশফিকের ধারাবাহিক রানবন্যায় বাংলাদেশ জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছায় ৬৩ বল হাতে রেখে।
২৫১ রানের জয়ের লক্ষ্যে ছুটতে নেমে উড়ন্ত সূচনা করে বাংলাদেশ দল। সৌম্য সরকারকে সঙ্গে নিয়ে ওপেনিংয়ে ১৪৫ রানের জুটি গড়েন তামিম ইকবাল। জুনায়েদ খানের শিকার হওয়ার আগে ৭৬ বলে আট চার ও এক ছক্কায় ৬৪ রান করে ফেরেন আগের দুই ম্যাচে ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি করা তামিম ইকবাল।
আগের দুই ম্যাচে টানা দুই সেঞ্চুরি করে এমনিতেই তামিম বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন। এ ম্যাচে শুরুটা খুব ভালো হলো না। তাই মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি অন্য কারো পালা। কিন্তু একটু আস্তে ধীরে ৬১ বলে ৪১ রানে পৌঁছানোর পর এ ম্যাচেই বোলিংয়ে ফেরা হাফিজকে ছক্কা মেরে শুরু করলেন তাণ্ডব। একসময় মনে হচ্ছিল প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টানা তৃতীয় সেঞ্চুরিতে পৌঁছে যাওয়া সময়ের ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত ৬৪ রানে একটু বিতর্কিত এক আউটে শেষ হল তামিমের এই ইনিংস।
ফলে টানা তিন ইনিংসে তামিমের রান যথাক্রমে—১৩২, ১১৬* ও ৬৪!
এই তিন দানবীয় ইনিংসের কল্যাণে নিজেরই রেকর্ড ছাড়িয়ে বাংলাদেশের হয়ে দ্বিপাক্ষিক কোনো সিরিজের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়ে গেলেন তামিম। সেই সঙ্গে ৩ ম্যাচের সিরিজে বিশ্বেরই তৃতীয় সেরা রান সংগ্রাহকের নাম এখন তামিম ইকবাল।
তবে সেরাটা জমিয়ে রেখেছিলেন সৌম্য সরকার। ৬৩ বলে হাফ সেঞ্চুরি করার পর রীতিমতো দানবীয় কাণ্ড শুরু করেন। পরের ৩১ বলেই পৌঁছে যান সেঞ্চুরিতে। আজহার আলীর বলে ছক্কা মেরে সেঞ্চুরিতে পৌঁছান ক্যারিয়ারের দশম ম্যাচ খেলতে নামা এই তরুণ। এরপরও তার ব্যাট থামেনি। শেষ পর্যন্ত দলকে জিতিয়ে যখন মাঠ ছাড়ছেন, সঙ্গী তার ১১০ বলে ১৩টি চার ও ৬টি ছক্কায় সাজানো ১২৭ রান। অন্য প্রান্তে আরও একটা ঝড় তোলা মুশফিক দল জেতানো ৪৩ বলে ৪৯ রান করে অপরাজিত।
এর আগে টস জিতে আগে ব্যাট করতে নামে পাকিস্তান। হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর জন্য শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে দুই ওপেনার আজহার আলী ও অভিষিক্ত সামি আসলাম। নাসির হোসেনের করা ১৮তম ওভারের শেষ বলটিকে সোজা ব্যাটে খেলতে গিয়ে উইকেট কিপার মুশফিকের হাতে ক্যাচ তুলে দেন সামি আসলাম। সাজঘরে ফেরার আগে নিজের ক্যারিয়ার শুরু ম্যাচে ব্যক্তিগতভাবে ৪৫ রান করার পাশাপাশি আজহারের সাথে ৯১ রানের জুটি গড়েন সামি।
উদ্বোধনীতে উড়ন্ত সূচনা করা পাকিস্তান এরপর খেই হারিয়ে ফেলে। তৃতীয় উইকেট জুটিতে হারিস সোহেলকে সঙ্গে নিয়ে ৯৮ রানের জুটি গড়েন আজহার আলী। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দুই ম্যাচে ৭২ ও ৩৬ রান করা আজহার এদিন সেঞ্চুরি করে ফিরেন। শতরান পূর্ণ করার পর নিজের ইনিংসটাকে দীর্ঘায়িত করতে পারেননি আজহার। সাকিব আল হাসানের শিকার হওয়ার আগে ১১২ বলে দশ বাউন্ডারির সাহায্যে ১০১ রান করেন আজহার আলী। তার বিদায়ের পর সময়ের ব্যবধানে উইকেট পড়ে গেলে সম্মান জনক স্কোর গড়তে পারেনি পাকিস্তান।
শেষ পর্যন্ত হারিস সোহেলের করা ৫২ এবং সাদ নাসিমের করা ২২ রানের কল্যাণে ২৫০ রান তুলতে সক্ষম হয় পাকিস্তান। বাংলাদেশ দলের হয়ে দুটি করে উইকেট সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মুর্তজা, রুবেল হোসেন ও আরাফাত সানি।
স্কোরকার্ড
পাকিস্তান রান বল চার ছয়
আজহার আলী ব সাকিব ১০১ ১১২ ১০ ০
সামি আসলাম ক মুশফিকুর ব নাসির ৪৫ ৫০ ৭ ০
মোহাম্মদ হাফিজ ব আরাফাত সানি ৪ ১৫ ০ ০
হারিস সোহেল ক মুশফিকুর ব মাশরাফি ৫২ ৫৮ ১ ২
মোহাম্মদ রিজওয়ান ক এন্ড ব সাকিব ৪ ৬ ০ ০
ফাওয়াদ আলম ক নাসির ব মাশরাফি ৪ ৯ ০ ০
সাদ নাসিম ক তাসকিন ব রুবেল ২২ ২৪ ৩ ০
ওয়াহাব রিয়াজ ক মাশরাফি ব রুবেল ৭ ৮ ১ ০
উমর গুল রান আউট (সাকিব/সানি) ০ ২ ০ ০
জুলফিকার বাবর অপরাজিত ১ ৪ ০ ০
জুনাইদ খান ব সানি ৪ ৬ ০ ০
অতিরিক্ত (লেগবাই ১, ওয়াইড ৫) ৬
মোট (৪৯ ওভারে অলআউট) ২৫০
উইকেট পতন : ১/৯১ (আসলাম), ২/১০৫ (হাফিজ), ৩/২০৩ (আজহার), ৪/২০৭ (হারিস), ৫/২১৩ (রিজওয়ান), ৬/২২৪ (ফাওয়াদ), ৭/২৪৩ (ওয়াহাব), ৮/২৪৪ (গুল), ৯/২৪৫ (নাসিম), ১০/২৫০ (জুনায়েদ)।
আজহার আলী ব সাকিব ১০১ ১১২ ১০ ০
সামি আসলাম ক মুশফিকুর ব নাসির ৪৫ ৫০ ৭ ০
মোহাম্মদ হাফিজ ব আরাফাত সানি ৪ ১৫ ০ ০
হারিস সোহেল ক মুশফিকুর ব মাশরাফি ৫২ ৫৮ ১ ২
মোহাম্মদ রিজওয়ান ক এন্ড ব সাকিব ৪ ৬ ০ ০
ফাওয়াদ আলম ক নাসির ব মাশরাফি ৪ ৯ ০ ০
সাদ নাসিম ক তাসকিন ব রুবেল ২২ ২৪ ৩ ০
ওয়াহাব রিয়াজ ক মাশরাফি ব রুবেল ৭ ৮ ১ ০
উমর গুল রান আউট (সাকিব/সানি) ০ ২ ০ ০
জুলফিকার বাবর অপরাজিত ১ ৪ ০ ০
জুনাইদ খান ব সানি ৪ ৬ ০ ০
অতিরিক্ত (লেগবাই ১, ওয়াইড ৫) ৬
মোট (৪৯ ওভারে অলআউট) ২৫০
উইকেট পতন : ১/৯১ (আসলাম), ২/১০৫ (হাফিজ), ৩/২০৩ (আজহার), ৪/২০৭ (হারিস), ৫/২১৩ (রিজওয়ান), ৬/২২৪ (ফাওয়াদ), ৭/২৪৩ (ওয়াহাব), ৮/২৪৪ (গুল), ৯/২৪৫ (নাসিম), ১০/২৫০ (জুনায়েদ)।
বোলিং : মাশরাফি বিন মুর্তজা ১০-০-৪৪-২, তাসকিন আহমেদ ২-০-২২-০, নাসির হোসেন ৭-০-৩৭-১, রুবেল হোসেন ৬-০-৪৩-২, আরাফাত সানি ১০-০-৪৩-২, সাকিব আল হাসান ১০-০-৩৪-২, সাব্বির রহমান ২-০-১৭-০, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ২-০-৯-০।
বাংলাদেশ
তামিম ইকবাল এলবিডব্লিউ ব জুনাইদ খান ৬৪ ৭৬ ৮ ১
সৌম্য সরকার অপরাজিত ১২৭ ১১০ ১৩ ৬
মাহমুদুল্লা ব জুনাইদ খান ৪ ১০ ১ ০
মুশফিকুর রহিম অপরাজিত ৪৯ ৪৩ ৬ ০
অতিরিক্ত (লেগবাই ১,ওয়াইড ৪, নোবল ২) ৭
মোট (৩৯.৩ ওভারে ২ উইকেটে) ২৫১
উইকেট পতন: ১/১৪৫ (তামিম), ২/১৫৪ (মাহমুদুল্লা)।
বোলিং: হাফিজ ৮-১-৩৭-০, উমর গুল ৭-০-৫৩-০, ওয়াহাব রিয়াজ ৬-০-৩০-০, জুনাইদ খান ৭.৩-০-৬৭-২, জুলফিকার বাবর ১০-০-৫৬-০, আজহার আলী ১-০-৭-০।
টস জয়: পাকিস্তান
ফল: বাংলাদেশ ৮ উইকেটে জয়ী। সিরিজ: বাংলাদেশ ৩-০ ব্যবধানে জয়ী
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: সৌম্য সরকার। ম্যান অব দ্য সিরিজ: তামিম ইকবাল
