আর মাত্র দুইদিন পর ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। আগামীকাল রবিবার মধ্যরাত থেকে শেষ হচ্ছে সব ধরনের প্রচারণা। তাই শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থিত মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রচারণা তুঙ্গে উঠেছে। এদিকে ভোট গ্রহণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও তিন সিটির দুইশ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নানা অজুহাত দেখিয়ে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়ঃ র্যাব, বিজিবিসহ বিপুলসংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকার পরও ভোটের দিন নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত হতে পারছেন না অনেক ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা। এই আশঙ্কায় নির্বাচন থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিতে প্রতিনিয়ত উচ্চ মহল থেকে তদবির করাচ্ছেন প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তারা। ইতিমধ্যে দুই শতাধিক ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা বিভিন্ন অজুহাতে নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। অনেকেই ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করতে চাচ্ছেন না। বিষয়টি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তিন সিটির রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে দীর্ঘ তিনমাস রাজনৈতিক সহিংসতার পর নির্বাচনী আমেজ সৃষ্টি হলেও ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন ভোটাররা। ইতিমধ্যে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের নির্বাচন সমন্বয়কারী।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, তিন সিটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। র্যাব,পুলিশ, আনসার, বিজিবিসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে। রিজার্ভ ফোর্স হিসাবে প্রতি সিটিতে এক ব্যাটালিয়ন করে সেনা সদস্য ক্যান্টনমেন্টে প্রস্তুত থাকবে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সবধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তিন সিটিতে ৪৮জন মেয়র প্রার্থী, ২৪৮ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও ৮৮৪জন সাধারণ কাউন্সিলরসহ ১ হাজার ১৮০জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত ৭ এপ্রিল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করেছেন। এরপর থেকে ঘুম হারাম করে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ভোটারদের দোরগোড়ায় ছুটছেন। ভোটারের মন জয়ের প্রতিযোগিতায় কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাইছেন না। তবে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের লড়াই হওয়ার কথা থাকলেও এ নির্বাচনে প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। ঢাকার দুই সিটির ৫৬ জন বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মামলার কারণে নির্বাচনী প্রচারের মাঠে নেই। এ পরিস্থিতিতে প্রার্থীদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই-ভাতিজা এবং দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকরা গোপনে প্রচারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ভয় আর গ্রেফতার আতঙ্কের কারণে নির্বাচনে পোলিং এজেন্ট পাচ্ছেন না বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা।
থাকছেন অর্ধলাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা: নির্বাচনে তিন সিটিতে প্রায় অর্ধলাখ ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশিক্ষণ শেষে গতকাল পর্যন্ত ৪৯ হাজার ৩৩৩ জনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৭০১জন প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ১৫ হাজার ৫৪৪জন, পোলিং অফিসার ৩১ হাজার ৮৮জন। প্রতি ভোটকেন্দ্রে একজন প্রিজাইডিং অফিসার, প্রতিকক্ষে একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং দুইজন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন।
নিরাপত্তা:দুই নগরীকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হচ্ছে ৩ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কাল থেকেই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হচ্ছে নিরাপত্তা চৌকি। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার মিলে প্রায় ৬৫ হাজার সদস্য এই নির্বাচনে মাঠে কাজ করছেন। ২৬ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত নির্বাচনী অপরাধ দমন ও সংক্ষিপ্ত বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৪৭৪জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪৪জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৩০ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন। নির্বাচনের রুটিন ওয়ার্কের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার আর সন্ত্রাসী, মাস্তানদের ধরতে পরিচালনা করছেন বিশেষ অভিযান।
বহিরাগত ও যানচলাচলে নিষেধাজ্ঞা: আজ ২৫ এপ্রিল রাত ১২ টার মধ্যে বহিরাগতদের নির্বাচনী এলাকা ত্যাগ করতে হবে। এ সময়ের পর সিটি এলাকায় কোন বহিরাগত অবস্থান করলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া আজ রাত ১২ টা থেকে ২৯ এপ্রিল সকাল ৬টা পর্যন্ত এই দুই মহানগরীতে মোটর সাইকেল এবং ২৭ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ২৮ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত ১২ ধরনের যানবাহন চলাচলও বন্ধ থাকবে। এসব পরিবহনের মধ্যে রয়েছে বেবী ট্যাক্সি/ অটোরিক্সা, ট্যাক্সি ক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, বাস, ট্রাক, টেম্পু, লঞ্চ, ইঞ্জিনচালিত সকল ধরনের নৌ-যান ও স্পিড বোট। তবে প্রার্থী, প্রশাসন ও অনুমোদিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হবে না।
বৈধ অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা: সিটি নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইসেন্সধারী অস্ত্রের মালিকদের আজ ভোর ছয়টা থেকে ১ মে রাত ১২টা পর্যন্ত সব ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রসহ চলাফেরা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালার বিধি ৭৪ এর উপ-বিধি (১) অনুযায়ী, ‘কোন নির্বাচনী এলাকায় ভোট গ্রহণ শুরুর পূর্ববর্তী ৩২ ঘণ্টা, ভোট গ্রহণের দিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা এবং পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে উক্ত নির্বাচনী এলাকায় কোন ব্যক্তি কোন জনসভা আহবান, অনুষ্ঠান বা তাতে যোগদান এবং কোন মিছিল বা শোভাযাত্রা সংগঠিত বা তাতে যোগদান করতে পারবেন না।’ উপ-বিধি (২) অনুযায়ী কোন আক্রমণাত্মক কাজ বা বিশৃঙ্খলামূলক আচরণ করতে পারবেন না। ভোটার বা নির্বাচনী কার্যে নিয়োজিত বা দায়িত্ব পালনরত কোন ব্যক্তিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা যাবে না। কোন অস্ত্র বা শক্তিও প্রদর্শন বা ব্যবহার করতে পারবেন না। উপ-বিধি (৩) অনুযায়ী উল্লেখিত আইন ভঙ্গ করলে ন্যূনতম ৬ মাস ও অনধিক ৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।