আগামীকাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এরই মধ্যে শেষ হয়েছে প্রচারণা। গত কয়েক সপ্তাহ ঢাকা ছিল নির্বাচনী প্রচারণায় মুখর। এই প্রচারণায় প্রার্থী-কর্মীদের সাথে যুক্ত হয়েছেন প্রার্থীদের সহধর্মিণীরাও। মহিলা অঙ্গনের পাঠকের জন্য এই প্রতিবেদনে মেয়র প্রার্থীদের পেছনে সহধর্মিণীদের অবস্থান ও তাদের চাওয়ার কথা জানাচ্ছেন রাবেয়া বেবী
প্রচারণা করতে গিয়ে দায়িত্ব বেড়ে গেছে
—রুবানা হক
সাহিত্যে পড়াশোনা করা রুবানা বরাবরই শিল্প সংস্কৃতির মধ্যে থাকতে চান। তাই প্রায়ই আয়োজন করেন সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য নির্ভর মিলনমেলার। অংশ নেন এমন অনুষ্ঠানেও। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় তার স্বামীর জন্য এবার প্রথম নামেন পথে। ১৯ বছর ধরে তিনি স্বামীর পাশাপাশি থেকে কাজ করে তাকে একজন প্রফেশনাল মানুষ হিসেবেও খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে রুবানা মহিলা অঙ্গনকে বলেন, যখন আনিস নির্বাচন করার এ সুযোগ পান আমি খুবই আনন্দিত হই এই ভেবে যে, এবার সে বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য ভালো কাজ করতে পারবেন।
অনেক দিনের সংসার জীবন তাদের। বড় সন্তানের বয়স ৩২-এ পড়েছে। তারপরও আনিস এখনো প্রতিদিন ইতিবাচক চিন্তা নিয়ে নবউদ্যমে এগিয়ে চলেন, বলেন রুবানা। তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক দরিদ্র মানুষ আছে আমরা জানি। তবে মিরপুর বাগান বাড়িতে গিয়ে আমার সেই ধারণায় নতুন এক দিক যোগ করে। এত দরিদ্র মানুষ এখনও আছে সত্যি বিশ্বাস হয় না। নিঃস্ব এই মানুষগুলো কিন্তু হাসতে পারে। তাদের হাত ধরে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত করাই আনিসের দায়িত্ব হয়ে যাবে। আর নারী হয়ে ঢাকাকে নারী বান্ধব করার দাবি তার স্বামীর কাছে। রুবানা বলেন, শুরুতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান যেমন রেল লাইন, বাসস্ট্যান্ড রাস্তায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে পরে তা সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। অনেক নারী আজ কাজ করে, ভোটারও তারা অর্ধেক। তাই তাদের জন্য তো মেয়রের কিছু দায় থেকেই যায়। রুবানা বলেন, তার স্বামী যদি রাজনীতিতে স্থায়ী হন তার অনেক উত্সাহ থাকবে। আর নিজে কোনোভাবে রাজনীতিতে যুক্ত না হয়েই স্বামীর সহযোদ্ধা হবেন। কারণ তিনি মনে করেন তার নিজের জগত্ গার্মেন্টস সেক্টর। সেই সেক্টরের মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারলেই তিনি তৃপ্তি পাবেন।
রাজনীতিবিদ হিসেবে তাবিথকে ৯৯ মার্কস দিব
—সওসান ইসকান্দার
একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তাবিথকে ৯৯ শতাংশ মার্কস দিতে চান তার স্ত্রী। তবে প্রথম যখন তাবিথ আউয়াল নির্বাচনের সুযোগটা পান তখন একটু ঘাবরে যান তার স্ত্রী সওসান ইসকান্দার। সওসানের পড়াশুনা দেশের বাইরে। তাই বলে দেশের এমন রাজনৈতিক পরিবেশ তার অজানা নয়। কিন্তু স্বামীর রাজনীতিটা তার কাজে একটা নতুন চ্যালেঞ্জও বটে। সওসান বলেন, মানুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে আমি আসলে গর্বিত। মানুষ এত ভালবাসা, হাত ধরে দোয়া করছেন, জয়ী হওয়ার জন্য। কারণ তখনই মনে হয় তাবিথ জয়ী হলে এই মানুষগুলোর চাওয়া পূর্ণ করা যাবে। সওসান বলেন, তাবিথ খুবই সত্ ও পরিশ্রমী মানুষ। চার বছরের সংসার জীবনে তাদের একটি ছেলে সন্তান আছে। এই চার বছরের অভিজ্ঞতা বলে সে মানুষের সাইকোলজি খুব ভাল বুঝতে পারে। যা জনপ্রতিনিধিদের দরকার। আর মানুষের প্রতিও তার ভালবাসা আছে সব মিলিয়ে তাবিথ জয়ী হলে নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে নতুন এক দিক উন্মোচিত হবে বলে মনে করেন তিনি। রাজনীতি করলে সংসারে সময় দেয়া যায় না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাবিথ অনেক দিন ধরে ব্যবসা করছেন, নানা রকম সমাজকর্মের সাথে জড়িত। তারপরও সন্তান আর স্ত্রীকে সময় দেন। তাই আমার বিশ্বাস তাবিথ ব্যালেন্স করে চলতে পারবে। নারীর জন্য তার স্বামী কেমন ঢাকা গড়বেন প্রশ্ন করলে বলেন, নারীর প্রতিও ওর যথেষ্ট চিন্তা আছে। সমাজে নারীকে নিরাপত্তা দিতে যা দরকার তাই আমার স্বামী করবে। প্রচারণা করতে গিয়ে নিজে কখনও জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন জানতে চাইলে বলেন, আমি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কন্সালটেন্ট হিসেবে কাজ করি। পাশাপাশি আমার আর কিছু কাজ আছে। একচুয়ারি বিষয়েও পড়াশোনা করছি। ক্ষুদ্র বীমা আমার কাজের ক্ষেত্র আমি সেই ক্ষেত্রে কাজ করে মানুষের উপকার করতে চাই।
রাজনীতিবিদ স্বামীর পাশে সারা জীবন থাকতে চাই
—আশফা হক লোপা
ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স এবং এক্সটেরিওর, ইনটেরিওর ডিজাইনিং-এ ব্যাচেলর করেছেন করা আশফা হক লোপা। ১৯৯৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর মাহি বি চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ে হয়। এক ছেলে এবং এক মেয়ের জননী তিনি। নিজে রাজনৈতিক পরিবারের না হলেও যেহেতু আমাদের পরিবার সমাজসেবার সাথে জড়িত ছিল সেহেতু রাজনীতিতে না থাকলেও মা, বাবার মতো আমিও সমাজ সেবায় উদ্বুদ্ধ হই। তিনি বলেন, ভোটারদের যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি সেটা অবশ্যই মানা হবে। মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছি না। ঢাকা কি আসলে নারী বান্ধব? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিশুকাল থেকেই মেয়েদের প্রতি ছেলেদের সম্মান জানানোর অভ্যাস গঠন করার ক্ষেত্রে মা, বাবার দায়িত্বই বেশি। মা, বোনসহ প্রতিটি নারীর প্রতি সম্মান জানাতে পারলেই সমাজ এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করি।
যেহেতু আমি নারী ও শিশু নিয়ে সমাজসেবার কাজ করছি, সেহেতু মেয়র হওয়ার পরও সে আমাকে এ কাজে আরও সহযোগিতা করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি নারী ও শিশুদের নিয়ে সমাজসেবার কাজ করছি এবং সে সবসময় আমাকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করেও আাাসছে। ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি। সাহায্য করে। প্রচারনা করতে গিয়ে কখনো কি মনে হয় আমিও একদিন রাজনীতিবিদ হবেন? তিনি বলেন, আমি শিশু ও নারীদের নিয়ে সমাজসেবায় আছি। তবে স্ত্রী হিসেবে আমার রাজনীতিবিদ স্বামীর পাশে সারা জীবন থাকতে চাই।
স্বামীর সঙ্গে নির্বাচনী মাঠে আছি
—ফারহানা সাঈদ
স্বামী ঢাকা দক্ষিণের আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকনের সাথে নির্বাচনী মাঠে লড়ছেন তার স্ত্রী ফারহানা সাঈদও। তবে ব্যবসায়ী পরিবারে বড় হওয়া ফারহানা বিয়ের আগে কখনো ভাবেননি বিয়ের পর এভাবে রাজনীতির মাঠে নামতে হবে। ফারহানা বলেন, ১৯৯৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয় মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের সাথে। তাদের চার মেয়ে আছে। বড় মেয়ে রিফা এবার ও লেভেল দেবে। একবারে ছোটটার বয়স দুই বছর।
ফারহানা সাঈদের কাছে প্রশ্ন, পুত্রের আকাঙ্ক্ষাই কি চার কন্যার জন্ম? সরল হাসির সাথে উত্তর, না কখনোই না। আমার শ্বশুড়-শাশুড়ি কিংবা স্বামী কখনই পুত্রের জন্য কোন আকাঙ্ক্ষা করেননি। এভাবে তারা কখনো চিন্তাও করেননি। আমার স্বামী এক ভাই আর তার দুই বোন। পরিবারে লোকসংখ্যা নিন্তান্তই কম। তাই শখ করেই আমাদের চার মেয়ের পৃথিবীতে আসা। তবে এটাও ঠিক সংসার করতে হলে কিন্তু ছেলে-মেয়ের উভয়েরই প্রয়োজন হয়। ফারহানা বলেন, রাজনৈতিক পরিবারে এসে তার অনেক শিক্ষা হয়েছে। শাশুড়ির কাছ থেকে তিনি হাতে-কলমে রাজনীতি করা স্বামীর সাহচার্য দেয়ার প্রশিক্ষণ পান। শুরুতে বাড়ি ভর্তি সরগরম আবহ ফারহানা স্বস্তি না পেলেও অল্প সময়ের মধ্যে তাতেই অভ্যস্ত হয়ে পরেন। আর এখন তো পথে-ঘাটে ভোটের ক্যাম্পেইন করে বেড়াচ্ছেন তিনি। আমার স্বামী নির্বাচিত হলে কি কাজ করবেন তা নিয়ে আলোচনা করতে ভাল লাগে। শুধু কি মজার বিষয় উপভোগ করেন রাজনীতিবিদের পরিবার- এমন প্রশ্নের জবাব দেন ফারহানা একটু কঠিন হয়ে। বলেন, না আমাদের যেমন মানুষ সম্মান করে, তেমন নেতিবাচকভাবে সামনেও সমালোচনা করে। সেই সবই আমরা মেনে নেই। নিজে কিংবা সন্তানদের কেউ কি সক্রিয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন ফারহানা? হেসে বলেন, সময় দাবি করলে আমি কিংবা আমার সন্তান সেই দাবি মেটাবে। কখনো কি মনে হয়েছে আপনার স্বামী রাজনীতিবিদ না হয়ে সাধারণ হলে ভাল হতো। তার উত্তর, আসলে আমার স্বামী ঘরে বাইরে সমানভাবে সময় দেন। সংসার আর মেয়েদের বিষয় নিজেই সবকিছু করেন। তাই আমার উল্টো ভাবার সুযোগই নেই। বরং আমারই মনে হয় আমি যদি তাকে আরো বেশি সহযোগিতা করতে পারতাম।
দক্ষ রাজনীতিকের মতো নির্বাচনী ময়দান
—আফরোজা আব্বাস
প্রচারণা ব্যাপারটি আফরোজা আব্বাসের ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগিয়ে। সে শুধু একজন গৃহিণীই নন, দক্ষ রাজনীতিকের মতো এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন রাজনীতির মাঠ। স্বামী বিএনপি সমর্থিত ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের হয়ে রীতিমতো নির্বাচনী লড়াই করছেন প্রতিপক্ষের সাথে। কিভাবে সামলাচ্ছেন এতসব, লড়ছেন নির্বাচনী লড়াই? আফরোজা আব্বাস বলেন, স্বামী মির্জা আব্বাস প্রচারণা চালাতে না পারায় পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে আমার ওপর। চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজটি করছি আমি। সমস্যা আসছে, তবে সেসব সাহসের সাথে মোকাবিলা করেই এগিয়ে যাচ্ছি। আব্বাস নির্বাচিত হলে এই সমস্যাগুলোর সমাধানের জোর চেষ্টা করতে পরামর্শ দেব। নির্বাচন এবং রাজনীতিও কিন্তু আমার থেকে কোনো অংশে আলাদা নয়। বিষয়টি মনে ধারণ করি বলেই মাইলের পর মাইল হেঁটে স্বামীর জন্য ভোট চাই।
একজন নারী হিসেবে পানি, বিদ্যুত্, যানজট আর আর্বজনা মুক্ত ঢাকার পাশাপাশি কি তিনি নারী বান্ধব ঢাকা চান না! প্রশ্ন করলে বলেন, অবশ্যই, বিষয়টি নিয়ে আমি চিন্তা করছি। মেয়েরা বর্ষবরণ উত্সবে গেলে কেন যৌন হয়রানির শিকার হবে? আমার স্বামী নির্বাচিত হলে আমি এই বিষয়টি অগ্রাধিকারভিত্তিতে দেখতে বলবো। বিয়ের পর থেকেই দেখেছেন শাহজাহানপুর এলাকাসহ দেশের রাজনীতিতে স্বামীর সক্রিয় অংশগ্রহণ। দুই ছেলে এক মেয়ের মা আফরোজা এরই মধ্যে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, এক ছেলেকে বিয়ে করিয়ে শাশুড়ি হয়েছেন। একজন নারী হয়ে স্বামী ছাড়া এই প্রচারণায় কোন অসুবিধা হয় কিনা জানতে চাইলে বলেন, সমস্যাটা নারী বলে নয়, বিএনপি বলে। তারা রীতিমতো সরকারের ও সরকারি দলের নানামুখী চাপের মধ্যে আছেন। আল্লাহর উপর ভরসা করে প্রতিদিনই নতুন উদ্যোমে বেড়িয়ে পরি। এই প্রচারণা কি তাকে নিজের জন্য রাজনীতি করতে অনুপ্রাণীত করে? এমন প্রশ্ন করলে, উত্তর দেন, সন্তানরা কিংবা নিজে প্রতিনিধি হয়ে রাজনীতি করবো কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।