নারী আজ পেশাদারিত্বের সব জায়গাতেই নিজেদের সামর্থ্য জানান দিচ্ছে। শিল্প, সাহিত্য, কলাবিদ্যায়ও তারা এখন সিদ্ধহস্ত। সিনেমা নির্মাণেও রাখছেন নিজেদের স্বাক্ষর। ডিরেক্টর মানে এখন শুধু আর পুরুষ পরিচালককেই বোঝায় না। কারণ নারীরাও এখন গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে বলতে শিখে গেছেন লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন! পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেয়া এমন চার এশীয় নারী নির্মাতার কথা জানাচ্ছেন সেলিম হোসেন
সামিরা মাখমালবাফ
সমকালীন সময়ে শুধু নারী নির্মাতাদের মধ্যে নয়, বরং সামগ্রিক বিবেচনায় সামিরা মাখমালবাফ জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্বচলচ্চিত্রের তালিকায়। একজন প্রভাবশালী সিনেমা নির্মাতা হিসাবে তিনি এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। ১৯৮০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ইরানের তেহরানে তার জন্ম। বাবা আরেকজন স্বনামধন্য সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাতা মহসিন মাখমালবাফ। সিনেমার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় সামিরা উচ্চবিদ্যালয়ের গণ্ডিও পার হতে পারেননি। পাঁচ বছর মেয়াদি সিনেমা নির্মাণের কোর্স করতে গিয়ে একাডেমিক পড়াশোনা ছেড়েছেন এই গুণী নির্মাতা। মাত্র দুটি ভিডিও প্রোডাকশন নির্মাণের পর মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি বিশ্বচলচ্চিত্রের অঙ্গনে হৈচৈ ফেলে দেন ‘আপেল’ সিনেমাটি নির্মাণ করে। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র— ‘ব্ল্যাকবোর্ড’, সেপ্টেম্বর ১১, এট ফাইভ ইন দ্য আফটারনুন এবং টুলেগ্ড্ হর্স।
হায়ফা আল মনসুর
কবি আব্দুর রহমান মনসুরের বারো সন্তানের মধ্যে অষ্টম হায়ফার জন্ম ১০ আগস্ট ১৯৭৪। বাবার আগ্রহেই হায়ফা সিনেমার প্রতি আকৃষ্ট হন। সৌদি আরবের মতো একটা কট্টর মুসলিমপ্রধান দেশের প্রথম নারী সিনেমা নির্মাতার নাম হায়ফা আল মনসুর। সৌদি আরবে একজন নারীর সিনেমা তৈরির প্যাশন খুব একটা সহজ তো নয়ই, বরং কঠিনতর চ্যালেঞ্জের বিষয়। অথচ হায়ফা সেই কাজটিই করে দেখালেন, কায়রোর আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে কাজের জন্য সৌদিতে ফিরে আসেন এবং সৌদিতে এসে দেখলেন নারীদের হিডেন লাইফ, পুরুষশ্রেণির চাপিয়ে দেয়া বাধ্যবাধকতা; যা তাকে ভীষণ পীড়া দেয়। ফলে সৌদিতে নারীদের এমন জীবনাচরণের ওপর ভিত্তি করেই তিনি নির্মাণ করতে উদ্বুদ্ধ হন ‘ওয়াদজা’। পুরো সিনেমাটা খুব কৌশলে শুট করেন সৌদির রাস্তায়। কারণ সৌদিতে সিনেমা শুট করা নিষিদ্ধ। এমনকি ওয়াদজা সিনেমার শুটিং যেখানে হয়েছে, সেখানটায় এখনো নিষেধাজ্ঞা অপরিবর্তিত আছে।
মিরা নায়ার
১৯৫৭ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের ওড়িশায় জন্ম নেয়া এই নারী নির্মাতা নিজের প্রথম ফিচার ফিল্ম দিয়েই বাজিমাত করে ফেলেন। ১৯৮৮ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমা ‘সালাম বোম্বে’। প্রথম সিনেমা মুক্তির পরই দুনিয়াব্যাপী তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। সালাম বোম্বে কান ফেস্টিভ্যালে গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার জেতে। এ ছাড়াও অস্কারে বিদেশি ভাষার শ্রেষ্ঠ সিনেমা হিসাবে মনোনীত হয় এটি। মিরা নায়ার একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক। তিনি অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে অভিষিক্ত হয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলো হলো নেমসেক, ভ্যানিটি ফেয়ার, দ্য প্যারেজ ফ্যামিলি ও অ্যামেলিয়া।
দীপা মেহতা
দীপা মেহতা ভারতীয় বংশজাত একজন কানাডিয়ান নাগরিক। তিনি ইন্দো-কানাডিয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসাবে পরিচিত। বিতর্কিত নির্মাতা হিসাবে তার নাম উচ্চারিত হলেও তিনি তার ‘ট্রিলোজি’ নির্মাণের জন্য বিখ্যাত। তার ‘ইলিমেন্টস ত্রয়ী’ হচ্ছে ফায়ার (১৯৯৬), আর্থ (১৯৯৮), ওয়াটার (২০০৫)। দীপা মেহতা তার ছবিতে নারী হূদয়ের ক্ষতকে যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। বিধবা নারীর সহমরণ, বাল্যবিবাহের প্রকোপ নিয়ে তিনি সফল কিছু কাজ করেছেন সিনেমার ভেতর দিয়ে। ফায়ার সিনেমায় সমকামিতা দেখানোর জন্য হয়েছেন ব্যাপকভাবে সমালোচিত।