আনিসুল হক, সাঈদ খোকন ও নাছির বিজয়ী

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০১৫, ১৭:১৬
 
তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী হলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা। ঢাকা উত্তর সিটিতে আনিসুল হক, দক্ষিণে সাঈদ খোকন এবং চট্টগ্রামে আ জ ম নাছির উদ্দিন বিপুল ভোটে জয় নিশ্চত করেছেন। তিন সিটির মধ্যে এই প্রথম ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে দুই অভিভাবক পেলেন নগরবাসী। গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে তিন সিটিতে ৩জন মেয়র, ১৩৪জন সাধারণ কাউন্সিলর এবং ৪৫জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেন। ভোট গ্রহণ শেষে সন্ধ্যার পর ভোট গননা শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র থেকে উত্তর সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহ আলম, মহানগর নাট্যমঞ্চে দক্ষিণ সিটির মিহির সারওয়ার মোর্শেদ এবং এম এ আজিজ স্টেডিয়াম মিলনায়তনে মো. আবদুল বাতেন চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের বেসরকারিভাবে ফল ঘোষণা শুরু করেন।               
 
রাত আড়াইটা পর্যন্ত সর্বশেষ প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী ঢাকা উত্তর সিটির ১০৯৩ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৬৪ টি কেন্দ্রে আনিসুল হক টেবিল ঘড়ি মার্কায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮২৮ ভোট, ঢাকা দক্ষিণে সাঈদ খোকন ৮৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে ৭৬২টি কেন্দ্রে ইলিশ মাছ মার্কায় ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫৬ ভোট ও চট্টগ্রামের ৭১৯ কেন্দ্রের মধ্যে ৭১৩টি কেন্দ্রে আ জ ম নাছির উদ্দিন হাতি মার্কায় ৪ লাখ ৭১ হাজার ২২০ ভোট পেয়েছেন। বেলা ১২টায় বর্জনের ঘোষণা দিলেও তিন সিটিতেই বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা নিকটতম প্রতিন্দ্বন্দ্বি হয়েছেন। এর মধ্যে প্রাপ্ত সমান সংখ্যক কেন্দ্রের ফলাফলে ঢাকা উত্তর সিটিতে তাবিথ আউয়াল বাস মার্কায় পেয়েছেন ২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৬৭ ভোট, দক্ষিণে মগ মার্কায় মির্জা আব্বাস পেয়েছেন ২ লাখ ৪৯ হাজার ৩৬০ ভোট এবং চট্টগ্রামে কমলালেবু মার্কায় মনজুর আলম পেয়েছেন ৩ লাখ ২ হাজার ৭১৭ ভোট। যে কয়টি কেন্দ্রের ফলাফল বাকি রয়েছে তাতে ফলে প্রভাব পড়বে না। ফল ঘোষণার পরে দেখা গেছে কয়েকটি কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা বিজয়ী হন। তবে কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে কে কোন ওয়ার্ডে জয়লাভ করেছেন তা বিস্তারিত জানা যায়নি। গভীর রাতে দুই নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের বিজয়ী কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিজয় মিছিল করতে দেখা গেছে। নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পড়েছে তা জানা যায় নি। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বাইরে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অধিকাংশ প্রার্থীই  জামানত হারিয়েছেন।
 
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০ এর বিধি ৪৪এর উপ-বিধি (৩) অনুযায়ী, ভোটগ্রহন বা ভোটগণনা সমাপ্ত হওয়ার পর যদি দেখা যায় যে, কোন প্রার্থী সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের এক অষ্টমাংশ অপেক্ষা কম ভোট পেয়েছেন, তা হলে তার জামানতের টাকা সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। ফলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৪২ প্রার্থীই জামানত হারাতে পারেন।
 
এর আগে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে তিন সিটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। উত্তরে ১৬জন, দক্ষিণে ২০জন এবং চট্টগ্রামে ১২জনসহ তিন সিটিতে ৪৮ জন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মেয়র-কাউন্সিলর মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১৮৮জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। ভোটগ্রহণের শুরুতেই কোথাও শান্তিপূর্ণ ভোট, আবার কোথাও বিচ্ছিন্ন অনিয়মের ঘটনা ঘটে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এর পরপরই ভোট কেন্দ্রগুলো কিছুটা ফাঁকা হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিজয় নিশ্চিত হয়ে যায়।
 
ঢাকার দক্ষিণ সিটিতে সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগে তিনটি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে উত্তর ও চট্টগ্রামের সব কেন্দ্রেই ভোট নেয়া হয়েছে। অনিয়মের ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমলাপুর শেরে বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের আশরাফ মাস্টার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় শ্যামপুর এবং ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সুরিটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে নির্বাচন কমিশন থেকে এক চিঠির মাধ্যমে দক্ষিণ রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ভোট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়।
 
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯ কোটি ৬২ লাখ ভোটারের মধ্যে তিন সিটি নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৬০ লাখ ২৯ হাজার ৫৭৬জন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ভোটার ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৪জন, দক্ষিণে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৩জন এবং চট্টগ্রামে ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৯ জন। তিন সিটিতে মোট ভোটকেন্দ্র ছিল ২ হাজার ৭০১টি, ভোটকক্ষ ছিল ১৫ হাজার ৫৪৪টি। ঢাকা উত্তরে ৩৬ জন সাধারণ ও ১২ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর, দক্ষিণে ৫৭ সাধারণ, ১৯জন সংরক্ষিত, চট্টগ্রামে ৪১জন সাধারণ ও ১৪জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
 
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্বাচনে ৮২ হাজার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাঠে ছিল। এর মধ্যে বিজিবির ১০৫ প্লাটুন, কোস্টগার্ডের ৭ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন ছিল। এছাড়া সাধারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পুলিশ ও আনসার সদস্য নিয়োগ করা হয়। পাশাপাশি তিন সিটির জন্য ৩ ব্যাটালিয়ান সেনা সদস্য ক্যান্টনমেন্টে প্রস্তুত রাখা হয়। কিন্তু তাদেরকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠে নামানোর প্রয়োজন পড়েনি।
 

প্রসঙ্গত, দীর্ঘ ১৩ বছর পর গতকাল ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ২০০৭ সালে মেয়াদ পূর্ণ হলেও নানা কারণে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০০৯ সালে নির্বাচন কমিশন উদ্যোগ নিলেও সরকারের সায় ছিল না  নির্বাচনে। ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বরে ৫৬টি ওয়ার্ড নিয়ে দক্ষিণ ও ৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে উত্তর নামে দুই ভাগ হয় ডিসিসি। ২০১২ সালের ২৪ মে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। আইনি জটিলতায় তা স্থগিত হয়ে যায়। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে আবার নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হলেও সীমানা জটিলতায় সেবারও নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সীমানা জটিলতা নিরসন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। গত ১৯ মার্চ ঢাকার দুই সিটির সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। এর আগে ঢাকায় ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল ও চট্টগ্রামে ২০১০ সালের ১৭ জুন সর্বশেষ সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।