সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিন সিটিতেই হামলা, লাঞ্ছনা ও বাধার শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। গতকাল ভোটকেন্দ্রগুলোতে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে ও ছবি তুলতে বাধা দেয়ার পাশাপাশি তাদের মোবাইল, মানিব্যাগ, ডায়েরি ও ক্যামেরা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে দুর্বৃত্তদের হামলায় কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। হামলার শিকার হয়েছে সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়িও। এছাড়া দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে এক সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সরকার দলীয় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকরাই অধিকাংশ হামলার ঘটনায় জড়িত বলে স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ করা হয়েছে। অনেক জায়গায় পুলিশও সাংবাদিকদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেয় ও হয়রানি করে।
সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সকাল সোয়া ১১টার দিকে বিজয়নগর বধির হাইস্কুলের পুরাতন ভবনে ‘জাল ভোট প্রদানরত’ কয়েকজনের ছবি তুলতে গেলে লাঞ্ছিত হন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি আশীষ-উর রহমান। অস্ত্র প্রদর্শন করে তাকে হুমকি দেয়া হয়। একই পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার মোশতাক আহমেদ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে নারিন্দার দক্ষিণ মৈশন্ডি স্কুলের সামনে লাঞ্ছিত হন। কেন্দ্র দখলের সংবাদ পেয়ে তিনি সেখানে যান। তার মোবাইল, ডায়েরি ও টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। শাহজাহানপুরের মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটে জাল ভোট প্রদানের সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে একই পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার সুজয় মহাজনের ওপর হামলা চালানো হয়। তার কাছ থেকেও দুইটি মোবাইল সেট ও অর্থ কেড়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। সবুজবাগে যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার ওবায়েদ অংশুমানের ওপর হামলা করে তার মোবাইল, মানিব্যাগ ও ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়া হয়। হামলায় তার পরনের পোশাক ছিড়ে যায়। সকাল সাড়ে আটটার দিকে সেগুনবাগিচা স্কুল কেন্দ্রে হামলার শিকার হন যুগান্তরের সিনিয়র ফটো সাংবাদিক শামীম নূর। প্রায় পৌনে এক ঘন্টা তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এছাড়া দুপুর দেড়টার দিকে সবুজবাগে বাসাবো বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হন অনলাইন নিউজ পোর্টাল রাইজিংবিডির রিপোর্টার ইয়াসিন রাব্বী।
বিকাল পৌনে চারটার দিকে আদাবরে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিকদের বহনকারী একটি সিএনজিতে হামলা চালায় আওয়ামী লীগের এক বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মীরা। সিএনজিতে থাকা ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার সমীর কুমার দে জানান, ঐ এলাকায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় এই হামলা চালানো হয়। এর আগে সকালে যাত্রাবাড়ীর শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংবাদ সংগ্রহকালে ইত্তেফাকের একজন স্টাফ রিপোর্টারসহ কয়েকজন সাংবাদিককে গালমন্দ করা হয়। ওয়ারির সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজে জালভোটের তথ্য পেয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় যুবলীগ নেতার নেতৃত্বে ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টারসহ কয়েকজন সাংবাদিককে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।
অন্যদিকে চট্টগ্রামেও হামলায় অন্তত চারজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। বাধার শিকার হয়েছেন অনেকে। সকালে দক্ষিণ হালিশহর কেজি অ্যান্ড হাইস্কুল কেন্দ্রের বাইরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। ঘটনাটি ক্যামেরায় ধারণ করার সময় কয়েকজন একাত্তর টিভির ক্যামেরাপারসন জহিরুল ইসলামের ওপর হামলা চালায় ও তার সাথে থাকা ক্যামেরা ভাংচুর করে। তাকে রক্ষা করতে গিয়ে সিনিয়র রিপোর্টার আজাদ তালুকদারও হামলার শিকার হন। আগ্রাবাদ ব্যাপারীপাড়ায় তালিবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে জালভোটের ছবি তুলতে গিয়ে হামলায় আহত হন আরটিভির ক্যামেরাপারসন পারভেজুর রহমান। তার ক্যামেরা ভেঙে ফেলে হামলাকারীরা। হামলাকারীদের গলায় হাতি প্রতীকের কার্ড ঝুলছিল।
এছাড়া হামলার শিকার অন্যান্য সাংবাদিকের মধ্যে রয়েছেন: দৈনিক সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি অমিতোষ পাল, যমুনা টেলিভিশনের রিপোর্টার আখলাক সাফা, সকালের খবরের ফটোসাংবাদিক বুলবুল আহমেদ, ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম মহসিন, দৈনিক মানবজমিনের কাফি কামাল ও দৈনিক সংগ্রামের জাফর ইকবাল। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি আবদুল হাই শিকদার এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরীও অপদস্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে ভোট চলাকালে তিন সিটিতেই বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক হামলা, লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হলেও তাত্ক্ষণিক কোন ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কমিশন কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও কেন্দ্রে প্রবেশে বাধার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশ।
দুপুরে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ বলেছেন, নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকদের কোন বাধা নেই। গণমাধ্যমকর্মীদের যেন কোন বাধা না দেয়া হয়, সেজন্য নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে এ ব্যাপারে কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এগুলো খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান।