তিনি লায়লা হাসান; যিনি একাধারে একজন শব্দ সৈনিক, নৃত্যশিল্পী, নৃত্যনির্দেশক, অভিনেত্রী। সেই ছোট্টবেলা থেকে আজ অবধি নৃত্যের সাথে তার সখ্য রয়েই গেছে। মাঝে অভিনয়ে অনিয়মিত থাকলেও আবারও নিয়মিত হয়ে উঠেছিন তিনি। বিস্তারিত লিখেছেন মাদিহা মাহনূর
অনেকটা অনির্ধারিত সময়েই লায়লা হাসানের সঙ্গে আলাপের জন্য বসি। তার বাসাতেই কথায় কথায় জমে উঠে আড্ডা। বাইরে যাওয়ার কিছুটা তাড়া থাকলেও ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ইত্তেফাক বলে কিছুটা সময় কথা বলেই গেলেন তিনি। অল্প কথায় জানা গেল তার জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
লায়লা হাসানের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। এম এ আউয়াল ও লতিফা আউয়াল দম্পতির সবচেয়ে আদরের সন্তান ছিলেন লায়লা। ৩০ জুন জন্ম নেওয়া এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ১৯৬৪ সাল থেকে মিডিয়ায় পাঁয়তারা। ছোটবেলা থেকেই নাচের সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। তার যতদূর মনে পড়ে, ছোটবেলায় তিনি নিজে নিজেই নাচ প্র্যাকটিস করতেন, তারপর বাবার কাছে নাচের মূল হাতেখড়ি হয়।
একটু বড় হওয়ার পর সাজেদুর রহমানের কাছে তিনি প্রথম নৃত্যচর্চা শুরু করেন। একসময় বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেন। এছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্কশপে নাচের ওপর বিশেষ তালিম নেন তিনি। শুধু নাচের কারণেই তিনি বিশ্বের প্রায় সবদেশেই ঘুরে বেড়িয়েছেন। যারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভারত, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, রাশিয়া, চীন, আমেরিকা, ব্রিটেনসহ আরও বেশকিছু দেশ।
বাংলাদেশ টেলিভিশন যখন সরাসরি নাটক প্রচার করত সেই সময়ে লায়লা হাসান প্রথম টিভি নাটকে অভিনয় কনে। সেই সময়ে তিনি আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘সমুদ্র অনেক দূর’ নাটকে আলতাফ হোসেনের বিপরীতে অভিনয় করেন। নিজের ঐতিহাসিক নাটকের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে লায়লা হাসান মোস্তাফিজুর রহমানের ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ ও ‘রক্তকরবী’ নাটকের কথা বলেন। ’৬৯-র গণআন্দোলনের সময় মঞ্চে ‘রক্তকরবী’ নাটকে অভিনয় করেন।
টিভিতে এবং মঞ্চে একই নাটকে তিনি চন্দ্রা চরিত্রে অভিনয় করে বেশ আলোচনায় চলে এসেছিলেন। আব্দুল্লাহ আল মামুনের এগারো পর্বের লোককাব্য নাটক ‘মন পবনের নাও’তেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘দম্পতি’তে লায়লা হাসান ও হাসান ইমাম একসঙ্গে অভিনয় করেন। লায়লা হাসান বলেন, ‘যদিও আমি অভিনয় করছি এখন কিন্তু নাচটা সবসময়ই আমার ভীষণ প্রিয়। একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতে আমি ভীষণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
তবে তারচেয়েও বেশি ভালো লাগে নিজেকে স্বাধীন বাংলা বেতারের একজন শব্দ সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিতে। এরচেয়ে ভালোলাগা আসলে আর কিছুতে নেই।’ জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেতা হাসান ইমাম লায়লা হাসানের স্বামী। তারসঙ্গে ১৯৬৫ সালের ৩০ জুন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন লায়লা। সেই থেকে সুখে দুঃখে তারা একসঙ্গে থেকেই জীবন পার করছেন।
লায়লা হাসান গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’, রিজভীর নির্দেশনায় রবি ঠাকুরের ‘ছুটি’ (স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র), সোহেল আরমানের ‘এইতো প্রেম’, কলকাতায় ‘বিনি সুতোর মালা’ (স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
১৯৯০ সালে লায়লা হাসান প্রতিষ্ঠা করেন নাচ ও অভিনয়ের স্কুল ‘নটরাজ’। এর অধিকর্তা হিসেবে শুরু থেকেই তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে নাচের অঙ্গনে বহু নৃত্যশিল্পীর জন্ম হয়েছে।
লায়লা হাসান এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছেন অনিমেষ আইচের ‘বিন্দু বিসর্গ’, সাইফুল ইসলাম মান্নুর ‘চলো হারিয়ে যাই’, এহসানুল হক সেলিমের ‘দূরত্ব’, ‘অভিবাসী’, ‘স্বর্ণশিখর’ ও রায়হান খানের ‘অর্কিড’ ধারাবাহিক নাটকের কাজ নিয়ে। প্রতিটি নাটকেই তিনি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে মাস্টার্স করা অভিনেত্রী কিংবা নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন কিংবদন্তি শিল্পী, যাকে এখনো অনেকেই অনুকরণ কিংবা অনুসরণ করেন।
ছবি গোলাম সাব্বির
