বিএনপিকে সন্ত্রাস ও জঙ্গি কর্মকাণ্ড ছাড়তে বলুন

আপডেট : ০২ মে ২০১৫, ২৩:৪২

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সন্ত্রাসের পথ ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ করে বিএনপিকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে আসার পরামর্শ দেবেন। গত শুক্রবার বিকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী এ আশা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন শুক্রবার বেলা ১টা ৪৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন এবং তাদের মধ্যে ১৪ মিনিট কথা হয়।

 
ফোনালাপে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণকে স্বস্তিকর বললেও মাঝপথে তাদের সরে দাঁড়ানোকে দুঃখজনক হিসাবে আখ্যায়িত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বান কি মুন। এ পরিস্থিতিতে সার্বিক বিষয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে দায়িত্ব দেয়ার কথাও প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন তিনি।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ মহাসচিবকে বলেন, গত ৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপি ৩ মাস ধরে দেশব্যাপী জ্বালাও-পোড়াও এবং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তারা পেট্রোল বোমা ও ককটেল নিক্ষেপ করে ড্রাইভার, হেলপার, নারী ও শিশুসহ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার সরকার জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তাসহ দেশের কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে নির্বিঘ্ন রাখতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
 
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কিছু অনিয়ম হয়েছে বলে তাকে জানানো হয়েছে, জাতিসংঘ মহাসচিব এমন কথা উল্লেখ করলে তাকে শেখ হাসিনা বলেন, সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কঠোর ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচনে কোন প্রকার হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। যা বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। তিনি বলেন, এর ফলে ৪৪ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে এবং এ নির্বাচনে দেয়া ভোটের সংখ্যায় তা অস্বাভাবিক নয়। তাই নির্বাচনের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার কোন অবকাশ নেই।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যেই ভোটের দিন বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে যায়। তিনি বলেন, ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার মাত্র ৩ ঘন্টার মধ্যেই বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জন করে। কারণ বিএনপি নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছেন ভোটারদের মনোভাব তাদের পক্ষে নেই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ আশা করে সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিহার করে বিএনপি গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসবে। তিনি বলেন, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা এবং সরকারি ও বেসরকারি সম্পদ ধ্বংস দেশবাসী কখনো মেনে নেবে না।
 
বিএনপিকে সন্ত্রাসের পথ থেকে ফেরাতে বান কি মুনের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, এ বিষয়ে অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে বলেছি। গণতান্ত্রিক পথ সুগম করতে প্রয়োজনে আলোচনা করবেন তিনি। প্রসঙ্গত, এর আগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে ২০১৩ সালে দুই দফা ঢাকা সফর করেন তারানকো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সরকারের সমঝোতার জন্য চেষ্টা চালান তিনি।
 
ফোনালাপে জাতিসংঘ মহাসচিব গণতন্ত্র সুসংহতকরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের অব্যাহত ও নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। বান কি মুন সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, গণতন্ত্রে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোন স্থান নেই। তিনি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, এমডিজি অর্জনে সাফল্য এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে আন্তরিকতা প্রকাশের জন্য বান কি মুনকে ধন্যবাদ জানান।
 
নির্বাচনে কেন্দ্র দখল ও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠলে ভোটের দিনই উদ্বেগ প্রকাশ করে তদন্তের আহ্বান জানান মান কি মুন। ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবকে বলেন, তাদের (বিএনপি) আন্দোলনের ডাকে জনগণ আসেনি, নেতা-কর্মীরাও আন্দোলনে থাকেনি। একইভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েও নেতা-কর্মীদের মাঠে নামাতে পারেনি তারা। নেতা-কর্মীদের পোলিং এজেন্ট বানিয়ে নির্বাচন কেন্দ্রেও পাঠাতে পারেনি তারা। কারণ তারা জনগণকে হত্যা করে আন্দোলন করেছে।
 
সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আরো নাশকতার পরিকল্পনা ছিল বিএনপির
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আরো নাশকতার পরিকল্পনা ছিল বিএনপির। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতায় তারা তা করতে পারেনি। গতকাল বিকালে গণভবনে পবিত্র বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গুরু ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির শাসনামলে কোনো ধর্মের মানুষই তাদের নির্যাতন-হামলা থেকে রেহাই পায়নি। তবে আওয়ামী লীগ সব সময় চায় দেশে সকল ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় অধিকার ভোগ করুক।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি আন্দোলনের মাঠে যা করেছে নির্বাচনী মাঠে এসেও তাই করেছে। তারা আন্দোলনের ডাক দিয়ে যেভাবে মাঠে থাকেনি একইভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েও তা প্রত্যাহার করেছে। হয়তো তাদের আরো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় তা আর সম্ভব হয়নি।  নইলে হয়তো আরো কিছু লাশ ফেলেই তারা নির্বাচন প্রত্যাহার করতো। তবে সেই সুযোগটা তারা পায়নি। কারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ ছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত চমত্কার কাজ করেছে, নিরাপত্তা দিয়েছে বলে তারা মানুষের ওপর আঘাত করতে পারেনি।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে ওনারা মাঠে নাই, তাদের প্রতিনিধি নাই, এজেন্ট নাই। কিছুই নাই। তিনি বলেন, হিংসা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা দেশকে শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
 

বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। আমরা একটা স্লোগান দেই— ধর্ম যার যার উত্সব সকলের। বাংলাদেশে এমন একটা পরিবেশ রয়েছে।