শরিকদের সঙ্গে বিএনপির নতুন করে দূরত্ব

আপডেট : ০৩ মে ২০১৫, ১১:২৫
তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সঙ্গে দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। একই ইস্যুতে সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা বাংলাদেশের সঙ্গেও নতুন করে দূরত্ব দেখা দিয়েছে বিএনপির। ভোট বর্জন করে মাঝপথ থেকে সরে গেলেও দুটি মিত্র শক্তির সঙ্গে বিএনপির সৃষ্ট এই টানাপোড়েনকে ‘অযথা একটি ঝামেলা’ হিসেবে দেখছেন বিএনপি ও ২০ দল শরিকদের অনেকে।

জামায়াত নেতাদের দাবি, নির্বাচনে অংশ গ্রহণ, জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ঘোষণা এবং ভোটের দিন ১২টার মধ্যেই বর্জনের ঘোষণা দিয়ে সরে যাওয়াসহ কোন বিষয়েই বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রেও তিন মেয়র প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সমন্বয় ছিল না। যার কারণে বিএনপি মাঝপথে ভোট বর্জন করলেও তিন সিটিতেই শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে ছিল জামায়াত। তিন সিটিতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে জামায়াত সমর্থিত পাঁচজন কাউন্সিলর প্রার্থী জয়ীও হয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকলেও ঢাকা ও চট্টগ্রামের নির্বাচনে ‘ক্ষমতাসীনদের ব্যাপক সন্ত্রাস, কেন্দ্র দখল ও ভোট জালিয়াতির’ ঘটনা ঘটেছে বলে ভোটের দিন জামায়াতের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেয়া হয়। তবে বিএনপির সঙ্গে সহমত পোষণ করে কোনো বর্জনের ঘোষণা ছিল না জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের পাঠানো ওই বিবৃতিতে। অবশ্য ভোটের দিন সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুল ইসলামের পাঠানো বিবৃতিতে ‘কলঙ্কজনক নির্বাচন’ প্রত্যাখ্যান করে নতুন করে সিটি নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হয়।

জানা গেছে, মেয়র পদে বিএনপি প্রার্থীদের সমর্থন নিয়ে আপত্তি না থাকলেও কাউন্সিলর পদে সমর্থন করা নিয়ে জামায়াতের আপত্তি ছিল। তিন সিটির কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে জামায়াত তাদের নেতা-কর্মীদের ২০ দল সমর্থিত প্রার্থী করতে চেয়েছিল। তবে এতে সায় দেয়নি বিএনপি, দলটির সমর্থন পেশাজীবীদের ফোরাম ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’ও এতে আপত্তি তোলে। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় বলতে গেলে জামায়াত এককভাবেই নির্বাচনে অংশ নেয়। কাউন্সিলর পদে সমর্থন ইস্যুতে সৃষ্ট এই মতপার্থক্যের জের পড়ে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের প্রচারণায়। যে কারণে তিন সিটিতেই বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের গণসংযোগ বা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়নি জামায়াত। এমনকি নির্বাচনকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত ২০ দলের সমন্বয় কমিটির সভাগুলোতেও যায়নি জোটের অন্যতম প্রধান এই শরিক।

জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে জামায়াত সাধারণ ওয়ার্ডে ১৯ জন, সংরক্ষিত ওয়ার্ডে সাতজনসহ ২৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিল। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে মাসুদা আক্তার (ওয়ার্ড ১২, ১৩ ও ১৪), আমেনা বেগম (২২, ২৩ ও ৩৬) ও কাওসার জাহান (২৯, ৩০ ও ৩২) নির্বাচিত হন। চট্টগ্রামে শফিউল আলম (৩৭ নম্বর ওয়ার্ড) ও ফারজানা ইয়াসমিন (সংরক্ষিত ৬ নম্বর ওয়ার্ড) জয়ী হন।

এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কার্যত: মেয়র পদে প্রার্থী সমর্থন নিয়ে বি. চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব দেখা দিয়েছে। বি. চৌধুরী চেয়েছিলেন বিএনপি যেন তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরীকে সমর্থন দেয়। এজন্য সংবাদ সম্মেলনে মাহী বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশার কথা জানান। কিন্তু বিএনপি শেষ পর্যন্ত সমর্থন দেয় আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়ালকে।

বিকল্পধারার একাধিক নেতা ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, গত ৫ জানুয়ারি থেকে টানা প্রায় তিন মাস অবরোধ-হরতালের সময় বিএনপির নেতা-কর্মীরা যখন আত্মগোপনে ছিলেন, তখন বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বি. চৌধুরী বিএনপির দাবির পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যখন নিজ কার্যালয়ে ‘অবরুদ্ধ’ ছিলেন, তখনও বি. চৌধুরী কয়েক দফায় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এমনকি আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পরেও বি. চৌধুরী এগিয়ে আসেন। এ কারণে বি. চৌধুরীসহ তার পরিবারের বিশ্বাস ছিল, দুঃসময়ের মিত্র হিসেবে এবং প্রার্থী সংকট দেখা দেয়ায় বিএনপি হয়তো মাহীকে সমর্থন জানাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এছাড়া ভোটের দু’দিন আগে মাহীর ওপর আক্রমণের ঘটনায় সন্দেহের তীর বিএনপির দিকেও রয়েছে।

মাহী বি. চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘এটা সত্য যে- জাতীয়তাবাদী শক্তির ভেতরে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। যারা চায় না জাতীয়তাবাদী শক্তি শক্তিশালী হোক, তারাই নিজেদের এজেন্ডা হিসেবে এই দূরত্ব সৃষ্ট করেছে। জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের যে সম্ভাবনা ছিল সেটি নষ্ট করা হয়েছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, তিন সিটি নির্বাচনে প্রার্থী সমর্থনের আগে ২০ দলের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত ছিল। তাহলে জামায়াতের সঙ্গে এই মতপার্থক্য দেখা দিতো না। এছাড়া ঢাকা উত্তরে মেয়র প্রার্থী সমর্থনের আগে বি. চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করলেও ক্ষতির কিছু ছিল না। তাহলে এই মান-অভিমান সৃষ্টির সুযোগ থাকতো না।