নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য: প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৪ মে ২০১৫, ০৯:৩৯
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ৯২ দিনের আন্দোলনে রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকা দিতেই সদ্য সমাপ্ত তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।  আসলে নির্বাচনে আসাটাই ছিল তাদের একটা নাটক। সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্যে।
 
গতকাল রবিবার রাতে গণভবনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আজম নাছির উদ্দিন নির্বাচিত কাউন্সিলরদের সঙ্গে নিয়ে সাক্ষাত করতে এলে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনের দিন ১১/১২টা না বাজতেই এমন কী ঘটনা ঘটলো যে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলো? তারা যেসব অভিযোগ তুলেছে তার একটা অভিযোগেরও প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। তিনি বলেন, বিএনপির উদ্দেশ্যেই ছিল নির্বাচনের দিন মানুষের লাশ ফেলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত সতর্ক ছিল বলেই তাদের সেই উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার এমন কোন দুর্বলতা নেই যে কেউ এসে বলবে আর মাথানত করে চলে যাব। শেখ হাসিনা অন্তত সেটা করবে না। এ দুর্বলতা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার রয়েছে। ক্ষমতার জন্য ২০০১ সালে উনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়েছিলেন। তখন আমি বলেছিলাম উনি গ্যাস বিক্রি করতে পারবেন না। মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসে গ্যাস বিক্রি করতে উনি পারেন নি। কারণ চোরের হাতে আল্লাহ কোন সম্পদ দেয় না।
 
রাত সোয়া আটটায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের নবনির্বাচিত মেয়র আজম নাছিরকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানান। আজম নাছিরও প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, মাহবুব-উল-আলম হানিফ, ড. হাছান মাহমুদ, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, এবি তাজুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম বিএসসি, এম আবদুল লতিফ এমপি, সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী এমপি, একরামুল হক এমপি, সাইমুম সরওয়ার  কমল এমপি, আশেক উল্লাহ রফিক এমপি, আবদুস সাত্তার এমপি, শাহজাদা মহিউদ্দিনসহ কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রামের বিপুল সংখ্যেক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
 
চার বিদ্যুেকন্দ্র উদ্বোধন, বিদ্যুত ব্যবহারে দেশবাসীকে মিতব্যয়ী হওয়ার আহবান :এর আগে বিকালে গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নাটোর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও ঘোড়াশালের ৩শ’ ১৫ মেগাওয়াট উত্পাদন ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন চারটি বিদ্যুত কেন্দ্র একযোগে উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামাঞ্চলে সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের সুযোগ-সুবিধা ও ভালভাবে থাকা নিশ্চিত করতেই বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তেলে মাথায় তেল দিতে আমরা ক্ষমতায় আসিনি। দেশের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছি বলেই আমাদের সমালোচনা করা হয়। টেলিভিশনের এসি রুমে বসে আমাদের নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বলতেন, যে গাছ ফল দেয় সেই গাছেই ঢিল পড়ে। নিষ্ফলা গাছে কখনো ঢিল পড়ে না। তাই সমালোচনা বা অপপ্রচারের দিকে না তাকিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি।
 
এই চারটি নতুন বিদ্যুত কেন্দ্র উদ্বোধন ছাড়াও রাজধানী ঢাকার লালবাগে ১৩২/৩৩/১১ কেভি বিদ্যুতের বৃহত্ উপ-কেন্দ্রও উদ্বোধন করেন তিনি। একইসঙ্গে মেঘনাঘাট-আমিনবাজার ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্পেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার মাত্র ৩২ শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ রেখে যায়। মাত্র ছয় বছরে দেশ আজ ১৩ হাজার ২৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত উত্পাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে। অদূর ভবিষ্যতে মোট উত্পাদন ১৯ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।
 
বিদ্যুত ব্যবহারে দেশবাসীকে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বেশি থাকলেই বেশি ব্যবহার সঠিক কাজ নয়। কম বিদ্যুত ব্যবহারে বিল কম হয়, অর্থ ব্যয়ও কম হয়। এতে সাধারণ মানুষের সুবিধাই নিশ্চিত হয়। কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র এবং কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুত প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, কুইক ও রেন্টাল বিদ্যুত্ নিয়ে সরকারের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে টকশোতে এক শ্রেণীর অংশগ্রহণকারীর সমালোচনা অনাকাঙ্ক্ষিত। আসলে টকশোতে অংশগ্রহণকারীরা এখন এয়ার কন্ডিশন রুমে বসে অতীতে গরমের ভোগান্তির কথা ভুলে গেছেন। ভারত থেকে আমরা বিদ্যুত আমদানী করছি এটাও তাদের দুঃখ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার এতো বেসরকারি টিভির লাইসেন্স দিয়েছে। আসলে উপকারীদের মনে রাখে কে?
 
ভবিষ্যতে বাসাবাড়িতে গ্যাসের লাইনের বদলে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা বাসা-বাড়ির বদলে বাণিজ্যিক অর্থাত্ কল-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করে উত্পাদন বাড়াতে চাই। সৌর বিদ্যুত নিয়েও তাঁর সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীতে সকল সেচ পাম্পগুলো যাতে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে চলে সেই উদ্যোগ নিয়েছি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত উত্পাদনের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিদেশ থেকে আমরা কয়লা আমদানী করব। এছাড়াও পরমাণুভিত্তিক এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত উত্পাদনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে এই খাতে বিদ্যুত উত্পাদন প্রথমে দুই হাজার এবং পরে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
 
প্রধানমনন্ত্রী বলেন, ভারত থেকে ইতিমধ্যে ৫শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত আমদানি করা হচ্ছে। আরো ৫শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আগরতলা থেকে পাওয়া যাবে একশ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত। মিয়ানমার থেকে বিদ্যুত ও গ্যাস আমদানিরও পরিকল্পনা রয়েছে।
 
ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে নাটোরে সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম কুদ্দুছ, নারায়ণগঞ্জের শামিম ওসমান এমপি, নরসিংদীতে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম, মুন্সীগঞ্জে এডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এমপি ও মহিউদ্দিন আহমেদ এবং লালবাগে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমের সঙ্গে কথা বলেন। মৃণাল কান্তি দাস ও মহিউদ্দিন আহমেদ মুন্সীগঞ্জের পূর্ব নির্ধারিত স্থানেই বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্থাপনের দাবি জানালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে আর হবে না, বিমানবন্দর হবে পদ্মানদীর ওপারেই।
 
বিদ্যুত বিভাগ এবং বিদ্যুত ও জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিদ্যুত ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, ড. তৌফিক-ই-এলাহী, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, সচিব সুরাইয়া বেগম, প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরীসহ বিদ্যুত বিভাগের কর্মকর্তারা।