সমুদ্রপথে মানবপাচার কোনভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। শক্তিশালী আন্ত:দেশীয় পাচারকারী চক্রের সাথে জড়িত স্থানীয় দালালরা ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দরিদ্র পরিবারের বেকার যুবকদের সংগ্রহ করে পাচার করছে বিদেশে। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। ভাগ্য অন্বেষণের স্বপ্নে বিভোর এসব যুবক অবৈধ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পথে বিদেশ পাড়ি গিয়ে হচ্ছে প্রতারণার শিকার। পাচারকারী চক্রই তাদের বিদেশের মাটিতে নিয়ে করছে অপহরণ। মুক্তিপণ না দিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা হচ্ছে নির্মম হত্যার শিকার। জানা গেছে, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গা আর স্থানীয় দালাল মিলে গড়ে তুলেছে মানবপাচারের সিন্ডিকেট। সম্প্রতি, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে পাচার হওয়া মানুষের লাশ উদ্ধারের পর আবারো বিষয়টি গণমাধ্যমে জোরালো আলোচনায় এসেছে। তারপরও নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, মানবপাচার চলছেই।
মানবপাচারের চিত্র যে কী ভয়াবহ তা ভুক্তভোগী তিনজন ব্যক্তির কথা শুনলেই বোঝা যায়।
ঘটনা -১ ঃ টেকনাফের সাবরাং আলির ডেইল এলাকার বাসিন্দা মো. আমিন বলেন, ‘গত দুই বছর আগে আমার ছেলে আবদুর রহিম শাহপরীর দ্বীপের দালাল ধুলু হোসেনের (বর্তমান কারাগারে) মাধ্যমে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিয়েছিল। এখনও পর্যন্ত তার কোন খোজঁ খবর পাওয়া যায়নি।’ মুক্তিপণ না পেয়ে দালালেরা অনেককে হত্যা করে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে যে গণকবর দিয়েছে তা আবিস্কারের খবর তিনি শুনেছেন। তিনি বলেন, ‘জানি না আমার সন্তান এখনও বেঁচে আছে কিনা।’
ঘটনা-২ ঃ সাবরাং ইউনিয়নের মুন্ডার ডেইল গ্রামের ইউপি সদস্য মো. ইউনুচ বলেন, সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে আমার এলাকার প্রায় ২০ জন লোক নিখোঁজ থাকার খবর রয়েছে। এমনকি দুই পরিবারের পাচঁ যুবক সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে দুই বছর ধরে নিখোজঁ রয়েছে। তাদের পরিবার শুক্রবার থাই জঙ্গলে গণকবরের খবর পেয়ে আমার কাছে জানতে চায় তাদের সন্তানের কোন সন্ধান পাওয়া গেছে কিনা।
ঘটনা -৩ ঃ দালালের নির্মম অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সমপ্রতি দেশে ফিরে আসা উখিয়ার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের মরিচ্যা গ্রামের ১৭ বছরের যুবক শফিউল আলম জানান, তাকে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে একটি বন্দিশালায় প্রায় একমাস ধরে মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা হয়। পরে তার পিতা বসতভিটা বন্ধক রেখে দালালদের চাহিদামত টাকা পরিশোধ করলে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু অনাহারে অত্যাচারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার আত্মীয় সহপাঠীদের সহযোগিতায় ৩ মাস পর সে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। শফিউল আলম আরো জানান, তার মতো শত শত যাত্রী দালালদের মৃত্যুপুরীতে আটক রয়েছে।
ভাগ্য বদলানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, দিনাজপুর, যশোর, ময়মনসিংহ, খুলনা ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছে। তাঁদের কারও চাকরি জোটে দুর্গম কোনো জঙ্গলে আবার কারও কারও নির্যাতনে মৃত্যু হয়। কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফের স্থানীয় ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক গড়ে উঠা একশ্রেণির মানবপাচারকারী দালাল চক্রের হাত ধরে বিদেশে ভাগ্য বদলানোর নেশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত পাচার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। বেসরকারি এনজিও সংস্থা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য মতে, গেল দুই বছরে প্রায় দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বিদেশে পাচার হয়েছে।
জানা গেছে, পাচারকারী চক্র সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দালালের সহযোগিতায় বিদেশ যেতে আগ্রহীদের খুঁজে বের করে চট্টগ্রামে এনে জড়ো করে। তাদেরকে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে নগরীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও বাসা-বাড়িতে রাখা হয়। ফলে কেউ কাউকে চিনতে পারে না। তারপর পরিস্থিতি বুঝে এসব মানুষদের পাচার করা হয়। আগে এসব লোকজনকে সরাসরি কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকায় নিয়ে গিয়ে ছোট ছোট বোটে করে গভীর সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে বড় ট্রলারে তোলা হতো। কিন্তু সড়কপথে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় ইদানিং কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত সাম্পানে করে কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন বা শাহপরীর দ্বীপের কাছে নিয়ে বড় ট্রলারে তোলার প্রবণতা বেড়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের তত্পরতায় প্রায়ই অবৈধভাবে মালয়েশিয়াগামী লোকজন উদ্ধার হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা পুলিশকে জানিয়েছে, স্বল্প টাকায় বিদেশে যাওয়ার জন্য তারা এ পথ বেছে নিয়েছে। আবার অনেকে অভিযোগ করেছে, তাদেরকে অপহরণ করা হয়েছে। মালয়েশিয়া নেয়ার নাম করে তাদেরকে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এ পাচার চক্রের সাথে চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলার কয়েক শ দালাল জড়িত রয়েছে। এরমধ্যে টেকনাফ থেকে শতাধিক ব্যাক্তিকে গডফাডার ও পাচারকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে। এদের মধ্যে ৩১ জনকে গডফাডার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। মানব পাচার চক্রের প্রধানদের মধ্যে অনেকে মিয়ানমারের নাগরিক।
এ ব্যাপারে গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম মহানগরীতেই ১৬৭ জনকে আসামি করে ২৯ টি মামলা করা হয়েছে, উদ্ধার করা হয়েছে ৮৫৮ জন ভাগ্যহত যুবককে। পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম জেলায় ৬৭ জনকে আসামি করে পাঁচটি মামলা করা হয়েছে, উদ্ধার করা হয়েছে ২০২ জনকে। কক্সবাজার জেলার শুধু উখিয়া থানাতেই ১৫৫ জন দালালের বিরুদ্ধে ৩১টি মামলা করা হয়েছে। ওইসব মামলায় ভিকটিম হিসেবে উদ্ধার করা তিন শতাধিক লোকজনকে তাদের আত্নীয় স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে পুলিশ জানালেও এলাকায় সন্তানহারা পরিবারের আহাজারি থামেনি।
গত মার্চ মাসে মানবপাচারকারী সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হামিদ করিম ও হামিদ হোসেন নামে দুই ভাইকে পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা কক্সবাজারকেন্দ্রিক একটি পাচারকারী সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত বলে পুলিশ জানায়। তবে এই দুইজন ছাড়া মানবপাচার চক্রের রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত উপ কমিশনার (গোয়েন্দা) তানভীর আরাফাত ইত্তেফাককে বলেন, অবৈধভাবে সমুদ্রপথে পাচার করার জন্য নগরীর বিভিন্ন বাসাবাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট এবং আবাসিক হোটেলে লোকজন জড়ো করা হচ্ছে বলে প্রায়ই আমাদের কাছে তথ্য আসে। তবে এসব লোকজন কখনোই তা স্বীকার করতে চায় না। তাদের কাছে পাসপোর্ট, ভিসা থাকে না। ফলে সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া পাচারের উদ্দেশ্যে জড়ো ব্যক্তিদের উদ্ধার করা বা কোনো দালালকে আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাছাড়া, মামলা হলেও গরীব মানুষরা সাক্ষ্য দিতে আসেন না। ফলে আসামিরা ছাড়া পেয়ে যায়।
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) বনজ কুমার মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, অবৈধপথে মানবপাচার একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মানবপাচার রোধে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
মুক্তিপন দিয়ে ফিরে আসা টেকনাফের মো. জুবাইর বলেন, ‘সুখের জীবন গড়তে মালয়েশিয়া পাড়ি আমার। কিন্তু দুঃখ যেন পিছু ছাড়ে না। দীর্ঘ আট মাস থাই জঙ্গলে মানবেতর জীবন যাপন করেছি। আমার মত হতভাগ্য দুই শতাধিক লোক ছিল। যারা টাকা দিত তাদের ছেড়ে দেওয়া হত। আরা যারা টাকা দিতে পারত না তাদের মারাত্মক নির্যাতন করত। জানি না আমার সাথে যারা ছিল তার আজ বেচেঁ আছে কিনা।’ তার মতে, আর যেন কেউ অবৈধভাবে সমুদ্র পথে পাড়ি না দেয়।
উখিয়া সংবাদদাতা রফিক উদ্দিন বাবলু জানান, উখিয়ার উপকূলীয় এলাকার ১৩টি পয়েন্ট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্র এবার অতি সঙ্গোপনে মানবপাচারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার ফলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। এমতাবস্থায়ও অনিশ্চিত সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে গিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের তৈরি করা থাইল্যান্ডের জঙ্গলে টর্চার সেল এখন মালয়েশিয়াগামীদের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।
উখিয়া-টেকনাফ উপকূলীয় এলাকায় মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করছে এমন একটি এনজিও হেলপ্ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক এম এ কাশেম জানান, মানবপাচার নিয়ে টাকা পয়সা লেনদেন ও নিখোঁজ যাত্রীর ঘটনা নিয়ে তাদের কাছে পাঁচ শতাধিক অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে উখিয়া-টেকনাফের উপকূল দিয়ে স্থানীয়, রোহিঙ্গা নাগরিক ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ৫০ হাজার লোককে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার যাত্রীর পরিবার পরিজন এখনো খোজঁ খবর পায়নি।
৪২ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) টেকনাফ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু জার আল জাহিদ বলেন, এ ধরনের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা থেকে লোকজনকে রক্ষা করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক, রাজনৈতিক নেতাসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।