নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে দেশে দুই ধরনের আইন বিদ্যমান ছিল। ১৯৯৫ সালের পুরনো আইনে ধর্ষণের ফলে মৃত্যু ঘটলে শাস্তি ছিল কেবল মৃত্যুদণ্ড। অন্যদিকে ২০০০ সালের নতুন আইনে একই অপরাধে শাস্তির বিধান মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন দণ্ড। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ’৯৫ সালের আইনের এ সংক্রান্ত ধারাগুলো গতকাল মঙ্গলবার অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। ফলে ২০০০ সালে আইন প্রণয়নের পূর্বের মামলাগুলো এখন এ আইনে বিচার্য হবে।
আপিল বিভাগ ২০০০ সালের ৩৪(২) ধারায় ৯৫ সালের পূর্বের মামলাগুলোর বিচারের যে এখতিয়ার দিয়েছিলো গতকাল তাও বাতিল ঘোষণা করেছে। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর বিচারকরা হলেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইনের ৬(২) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, “যদি কোন ব্যক্তি ধর্ষণ করিয়া কোন শিশু অথবা নারীর মৃত্যু ঘটান বা ধর্ষণ করার পর কোন শিশু বা নারীর মৃত্যু ঘটান তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।” (৩) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, “যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন শিশুকে বা নারীকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে ঐ সকল ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।” (৪) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, “যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করিয়া কোন শিশুকে বা নারীর মৃত্যু ঘটান বা ধর্ষণ করার পর কোন শিশু বা নারীর মৃত্যু ঘটান তাহা হইলে ঐ সকল ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।” কিন্তু ২০০০ সালে সরকার ৯৫ সালে প্রণীত আইনটিকে রহিত করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন নামে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু ২০০০ সালের পূর্বের মামলাগুলো ৯৫ সালের আইনের বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হবে বলে একটি ধারা সংযুক্ত করে দেয়। এই আইনের ৩৪(২) ধারায় বলা হয়, “উক্তরূপ রহিতকরণের অব্যবহিত পূর্বে উক্ত আইনের অধীন অনিষ্পন্ন মামলা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে এবং অনুরূপ মামলায় প্রদত্ত আদেশ, রায় বা শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল সংশ্লিষ্ট আদালতে এমনভাবে পরিচালিত ও নিষ্পত্তি হইবে যেন উক্ত আইন রহিত করা হয় নাই।” এই বিধানের ফলে নতুন আইন প্রণয়নের আগে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় যেসব মামলা দায়ের করা হয়েছিলো তার বিচার এখনো চলছিলো ৯৫ সালের আইনে। অন্যদিকে ২০০০ সালের আইনে একই অপরাধে দুই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিলে। আদালত চাইলে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দিতে পারতেন। এ সংক্রান্ত ৯(২) ধারায় বলা হয়েছে, “যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে ও দণ্ডনীয় হইবেন? (৩) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, “যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যূ ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যূদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে ও দণ্ডনীয় হইবেন?
এই রায়ের ফলে ১৯৯৫ সালের আইনে বিচারাধীন মামলায় যাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিলো তাদের ভবিষ্যত্ এখন কী হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর হয়ত বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাষ্ট (ব্লাষ্ট) ও শুকুর আলী নামে এক ব্যক্তি এক দেশে দুই আইনের এই বিধান চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছিলো। আদালতে তাদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমআই ফারুকী, তাদেরকে সহায়তা করেন এবিএম বায়েজীদ ও নাজনীন নাহার এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম।