সম্পর্ক নতুন মাত্রায় উন্নীত হলো

আপডেট : ০৮ মে ২০১৫, ১১:০৫

১৯৭৪ সাল। আজ থেকে ৪১ বছর আগের কথা। চুক্তি হল মুজিব-ইন্দিরা। এই চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কত না কথাই হয়েছে। গোটা দেশের রাজনীতিতে উলোট-পালোটও কম হয়নি। বিতর্ক-পাল্টা বিতর্কে ঘটে গেছে বহুদিন। একে গোলামী চুক্তি আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশকে ভারতের নামে লিখে দেয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণও এক সময় এরকম অভিযোগ বিশ্বাস করতে শুরু করে। কিন্তু বাস্তববতা যে ভিন্ন তা আজ ৪১ বছরে পা রেখে প্রমাণ হল, মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিটি নেহাতই দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্র পাকাপোক্ত করা আর ন্যায্য হিস্যা ভাগাভাগির। ঐতিহাসিক চুক্তিটি শেষঅবধি দুই দেশের জনগণকে রাখিবন্ধনে আবদ্ধ করলো। বাংলাদেশ পেল তার ন্যায্য সামীনা আর ভারত আবারও স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশের জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে।  ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ সমর্থন আর শরণার্থী  আশ্রয় দিয়ে ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল। আর ওই যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখাকে ফিরিয়ে দিয়ে আবারও প্রমাণ করলো তারা বাংলাদেশেরই বন্ধু। যদিও মোদী সরকারের কূটনৈতিক লক্ষ্যই হচ্ছে আঞ্চলিক বন্ধুত্ব জোরদার করা। বলা চলে তারই অংশ হিসাবে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বস্ত সম্পর্ক ধরে রাখতে চাইছেন। তাই আগের অবস্থান পরিত্যাগ করে শেষতোক তিনিই উদ্যোগী হয়ে বাংলাদেশ স্থল সীমানা বিরোধে ভূমিকা রাখলেন। আর তা সে দেশের সর্বোচ্চ আইন সভায় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পাকাপোক্ত করে রাখলেন।

 
এটি শুধু ঐতিহাসিক বিবেচনায় না নিয়ে বন্ধুত্বের বিবেচনাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন অনেকেই। গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ ঘটনাকে বিশ্লেষণ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক দু’জন বিশিষ্ট গবেষক ও বিশ্লেষক। এরা হলেন ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এবং দেলোয়ার হোসেন। ভারতের লোকসভায় সর্বসম্মতভাবে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা। দুই দেশের সরকারের মাধ্যমে শিগগিরই এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দ্বিপাক্ষিক অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের পথ আরো প্রশস্ত হবে বলে আশা করছেন তারা।
 
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সম্ভাবনা সম্পর্কে আমরা সবসময় আশাবাদী। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বন্ধনও ঐতিহাসিক ও আন্তরিক। কিন্তু কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয় আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লোকসভায় স্থল সীমান্ত চুক্তি সম্পর্কিত বিলটি পাস হয়ে যাওয়ায় সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে আর কোনো বাধা নেই। দুই দেশের সরকারের এখন উচিত হবে, দ্রুততর সময়ের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়ন করে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো। তিনি বলেন, এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে। 
 
ড. দেলোয়ার হোসেন
 
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার অপেক্ষাকৃত বেশি উদ্যোগী হয়েছে। এরপরও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা ঘাটতি রয়ে গেছে। এ চুক্তি সম্পাদিত হলে আস্থার ঘাটতি অনেকটা কমবে।
 
তিনি বলেন, এশিয়ায় অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান ও বিকাশ ঘটছে। এ অবস্থায় আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ-সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। আর বিনিয়োগের জন্য আস্থা জরুরি। লোকসভায় বিলটি পাস হওয়ায় সেই ঘাটতি দূর হয়ে সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নেবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব বাড়বে।
 

দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিগত কংগ্রেস সরকারের সময় স্থল সীমান্ত চুক্তির ব্যাপারে বিজেপি বিরোধিতা করেছিল। এর আগে বাজপেয়ী সরকারের সময়ও চুক্তির বিল উত্থাপনের প্রক্রিয়া ধীর হয়ে গিয়েছিল। এখন নরেন্দ্র মোদী সরকারের সময় এ চুক্তি অনেকটাই অবিশ্বাস্য। বিলটি পাস হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, বিজেপি আগের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসেছে। নতুন কূটনীতির ধারা এখানে প্রয়োগ হয়েছে। এ ধ্যান-ধারণা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে। শুধু সরকারের সাথে সরকারের নয়, জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্কেরও উন্নতি ঘটবে।