অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা ফুল

আপডেট : ০৯ মে ২০১৫, ১৭:২০
দিনে দিনে দারুণ সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে বাংলাদেশের ফুলের বাজার। এক্ষেত্রে অনেক প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে বাংলাদেশের ফুলের বাজার বিস্তৃত হয়েছে। দ্রুত বিকশিত হচ্ছে ফুলের বাজার। বর্তমানে পৃথিবীর ২০টি দেশে বাংলাদেশের ফুল এবং ফুলজাত পণ্য রফতানি হচ্ছে। ৫০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী ফুল বাণিজ্যের পরিমাণ ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও কম ছিল। ১৯৯৪-এ এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বজুড়ে পুষ্পবাণিজ্যের দারুণ প্রসারের প্রকাশ সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বাংলাদেশেও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানেও ফুল চাষ, উত্পাদন এবং এর বাজারজাতকরণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২৫০০ একর জমিতে ফুলের চাষ হতো, যা ২০১৪ তে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার একশ’ তেতাল্লিশ দশমিক ৬৭ একরে।
 
এখন প্রাত্যহিক জীবন-যাপনে ফুলের কদর অনেক বেড়েছে। ফলে ফুলের ব্যবহার হচ্ছে নানা কাজে, নানাভাবে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে শুভেচ্ছা স্বরূপ উপহার হিসেবে ফুলের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। এর বাইরে বিভিন্ন উত্সবে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অন্যকে উপহার দিতেই বছরজুড়ে বিপুল পরিমাণ ফুল কিনছেন। বিশেষ করে বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে, জন্মদিনে, বিবাহবার্ষিকী, রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মসূচিগুলোতে ফুল আবশ্যিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নাগরিক জীবনে চাহিদা মাফিক ফুলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোতে ফুলের বিরাট পসরা সাজিয়ে বসছেন ফুলের ব্যবসায়ীরা। গড়ে উঠেছে অসংখ্য পুষ্পবিপণী। প্রতিদিন যেখানে বিরাট অংকের অর্থের বাণিজ্য হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার শাহবাগ, বেইলি রোডসহ আরো কয়েকটি জায়গায় অসংখ্য দোকান নিয়ে গড়ে উঠেছে বিরাট ফুলের বাজার। বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলোতে যেমন, বিজয় দিবস, ২১ শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবসের পাশাপাশি ভ্যালেন্টাইনস ডে, পহেলা ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখ প্রভৃতি দিনে উত্সব আনন্দের অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যাপক পরিমাণে ফুলের ব্যবহার হচ্ছে। এসব দিনগুলোয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, খুলনার মত বড় বড় শহরগুলোতে তো বটেই অন্যান্য শহর এমনকি মফস্বল পর্যায়েও ফুলের বিক্রি বাড়ছে। আর এভাবেই দেশে ফুলের বাজার রমরমা থাকছে বছর জুড়েই।
 
গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, বেলী, কামিনী, ডালিয়া, সূর্যমুখী, পদ্ম প্রভৃতি ফুল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। আজকাল অনেকেই অধিক মুনাফার আশায় প্রচলিত ধান-পাট ও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য উত্পাদনের চেয়ে ফুলচাষের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় ইতিমধ্যে ফুলচাষীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যার ফলে দেশে ফুল উত্পাদনের পরিমাণ অনেকগুণ বেড়েছে। দেশে ফুল চাষ ও উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এ খাত ক্রমেই বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর মাধ্যমে ফুল রফতানি পরিমাণ বেশ ভালো একটি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের তালিকায় ফুল আগামী দিনগুলোতে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। দেশে ফুল উত্পাদন, বাজারজাতকরণ এবং  রফতানির মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রাই উপার্জনের পাশাপাশি এর মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফুল বাণিজ্যে এখন নিয়োজিত রয়েছেন অনেক মানুষ। এ খাততে এগিয়ে নিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন দেশে ফুল রফতানির পরিমাণ বাড়িয়ে যাতে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করা যায়- সে লক্ষ্যে সব ধরনের উদ্যোগ এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি পর্যায় থেকে এ খাতের সহযোগিতা করতে হবে।   
 
পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী সমিতির মতে, ফুল রফতানি বাড়াতে হলে বিশ্বের যেসব দেশে ফুলের বড় বড় মার্কেট আছে, সেসব দেশের সঙ্গে রফতানি পণ্য তালিকায় ফুলের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিমানের ভাড়া কমানোসহ কার্গো নিশ্চিত এবং কোল্ড ভেসেলের ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকা শহরে প্যাকেজিং এবং গ্রেডিংয়ের জন্য মার্কেট সংলগ্ন শেল্টার তৈরি করতে হবে। ফুল সতেজ ও তরতাজা এবং বীজ সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন করতে হবে। ফুল উত্পাদন, বাজারজাত ও রফতানি নীতিমালা প্রণয়নসহ বীজ উত্পাদন প্রযুক্তি গবেষণা এবং টিস্যুকালচার ল্যাব স্থাপন করতে হবে। ফুল চাষি, ফুল ব্যবসায়ী এবং ডিজাইনারদের পোস্ট হার্ভেস্ট ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একটি ফ্লোরিকালচার বোর্ড গঠন করে তার আওতায় সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং ফুল চাষি, ব্যবসায়ীদের উত্পাদন, বাজারজাত, প্যাকেটিং এবং মার্কেট চেইন বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ প্রদান করা প্রয়োজন। একটি আধুনিক কোল্ডস্টোরেজ তৈরি করার জন্য স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকদের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা করলে এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ফুলের বাজার তৈরি করলে কৃষকরা ফুল চাষে এগিয়ে আসবেন। তাতে দেশের ফুল উত্পাদন বাড়বে। দারিদ্রবিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশ্ববাজারে ফুল রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আরও বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবে বাংলাদেশ।