বোরোর ফলন ভালো দাম কম, লোকসানের আশঙ্কায় চাষিরা

আপডেট : ১০ মে ২০১৫, ০১:০৬

কৃষি উপকরণ সহজলভ্য হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলায় এবারো বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকরা প্রত্যাশা মতো ফসল ঘরে তুলতে পারলেও ধানের দাম কম হওয়ায় তারা লোকসানের হুমকিতে পড়েছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরঃ

 
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, শষ্য ভাণ্ডার নামে খ্যাত জয়পুরহাট জেলার পাঁচ উপজেলার সর্বত্র এখন চলছে বোরো ধান কাটা-মাড়াই উত্সব। ফলন ভাল হলেও বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি নেই। জেলায় সরকারিভাবে এখনো ধান কেনা শুরু হয়নি। ফলে কৃষকরা ন্যায্য দাম থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
 
জেলায় মাঠের পর মাঠ জুড়ে এখন সোনালী ধান। তিন দফা কাল-বৈশাখী ঝড়ের আঘাত ও শিলা বৃষ্টিতে ধান গাছ মাটিতে পড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তারপরও বাম্পার ফলন হওয়ায় খুশি কৃষকরা। কৃষকরা জানান, সার, বীজ, কীটনাশক, পানি সেচ ও দিনমজুরসহ প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ১২/১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন হয়েছে ১৫/১৬ মণ ধান। এ হিসেবে প্রতি মণ ধান উত্পাদনে খরচ পড়েছে ৮শ টাকার উপরে। বাজারে বর্তমানে ধান বিক্রি হচ্ছে প্রকার ভেদে ৪শ ৫০ থেকে ৫শ টাকা মণ (৪০ কেজি)। দাম কম হওয়ায় কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকারি ভাবে সংগ্রহ অভিযান শুরু না হওয়ায় স্থানীয় ফড়িয়া ও মজুতদারদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
 
কাউনিয়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, রংপুরের কাউনিয়ায় বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ধানের ফলন হয়েছে ভালো। হাটগুলোতে নতুন ধান উঠতে শুরু করেছে। তবে মৌসুমের শুরুতে ধানের বাজার চলে গেছে ফড়িয়া-পাইকারের দখলে। কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরুর কথা বলা হলেও এ উপজেলায় এখনো ধান কেনা শুরু হয়নি। কৃষকরা বলছেন, এবার বোরোর ভালো ফলন হয়েছে; কিন্তু বাজারে দাম কম হওয়ায় উত্পাদন খরচ উঠবে কিনা তা নিয়ে তারা শঙ্কিত। ফলে চাষিদের মুখে হাসি নেই। তারা জরুরি ভিত্তিতে সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু করার দাবি তুলেছেন।
 
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে কৃষক; কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে ধানের চাহিদা নেই। নেই মূল্যও। বর্গা চাষিরাও পড়েছে মহাবিপদে। লাভের আশায় চাষাবাদ করে এখন গুনতে হচ্ছে লোকসান। হাতিয়া ইউনিয়নের কৃষক রহিম জানান, ধান বিক্রি করে উত্পাদন খরচই মিটছে না। এ পরিস্থিতি উপজেলার সর্বত্রই। কৃষির উপর নির্ভরশীল অনেক কৃষকের দাবি, ধানের মূল্য না বাড়ালে তাদের পথে বসতে হবে।
 
সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, নীলফামারীর সৈয়দপুরের ৫টি ইউনিয়নে বোরোর বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ধানের দরপতন কেড়ে নিয়েছে তাদের হাসি। চলতি মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও সৈয়দপুরে এবার বোরোর ফলন রেকর্ড ছাড়িয়েছে। উপজেলার সর্বত্র এখন ধান কাটা-মাড়াইয়ের ধুম। সেই সাথে শ্রমিকের মজুরি ও সাংসারিক প্রয়োজনে নতুন ধান হাটে-বাজারে বিক্রিও চলছে; কিন্তু ধানের দরপতনে কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। প্রতিবস্তা (৭৫ কেজি) ধান মাত্র ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে এক কেজি ধানের বর্তমান বাজার মূল্য হচ্ছে ১০ টাকা। এতে করে কৃষককে প্রতিকেজি ধানে লোকসান গুনতে হচ্ছে ২ টাকা ৬৮ পয়সা।
 
মিঠাপুকুর (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, এ বছর মিঠাপুকুরে ৩১ হাজার ৬শ’ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। গত বারের চাইতে এবার ফলনও হয়েছে বেশি। কিন্তু ধান পাকার পর থেকে দুশ্চিন্তায় পড়েছে উপজেলার কৃষকরা। ধান কাটার শ্রমিক না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। কৃষকরা জানায়, ধান কাটার শ্রমিকের অভাবে পাকা ধান ক্ষেত থেকে কাটতে না পারায় ঝড়, শিলাবৃষ্টি আর পাখির উপদ্রবে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
 
উপজেলার রাণীপুকুরের লালচন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক তোজাম্মল হোসেন জানান, এ বছর ৫ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। জমি চাষ, চারা রোপণ, জমিতে পানি দেয়া, নিড়ানি (আগাছা পরিষ্কার), ধান কাটাসহ বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ৬ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। যদি ধানের দাম ভালো হতো তাহলে লাভের মুখ দেখতেন বলে জানান তিনি।
 
বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, কয়েক দফা কালবৈশাখীর ছোবল,  তিন দফায় শিলাবৃষ্টি, ভারী বৃষ্টিপাত এবং ফসল কাটার মাত্র দিনকয়েক আগে হঠাত্ যমুনার পানি বৃদ্ধি— এতসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠেও ধানের বাজার নিম্নমুখী থাকায় হতাশ পাবনার বেড়া উপজেলার বোরো চাষীরা।
 
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ৫ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। ধানের চারা পরিচর্যার প্রথম পর্যায়ে প্রাকৃতিক সমস্যা না হলেও প্রথম ক্ষতি হয় শিলাবৃষ্টিতে। তারপর ধান যখন সবুজ হয়ে মাঠে দোল খাচ্ছিল তখন কয়েকদিন পরপর বৃষ্টি এবং কালবৈশাখী ঝড় এবং শিলাবৃষ্টিতে নিচু এলাকার অনেক ধান মাটিতে পড়ে যায়।
 
এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কৃষকরা জানিয়েছেন, ধানের ফলন ভালো। যতটা ক্ষতির আশংকা করা হয়েছিল তা হয়নি। তবে তাদের দুশ্চিন্তার কারণ ধানের বাজার।
 
বেড় চতুর বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, বাজারে প্রচুর বিক্রেতা তাদের ধান নিয়ে বসে আছে। কিন্তু বোরো ২৮ ধান ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকের মণ প্রতি ২০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুণতে হচ্ছে।
 
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, নেত্রকোনায় এবারও বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। আর আগাম বন্যায় অন্যান্য জেলায় বোরোর ক্ষতি হলেও নেত্রকোনা জেলায় এবার কৃষকরা ৪টি হাওর উপজেলার একশ’ ভাগ ধানই ঘরে তুলতে  পেরেছে। এতে কৃষকরা দারুণ খুশী। ধান কাটার আগে কয়েকদিন বৃষ্টি হওয়ায় হাওর উপজেলার কৃষকরা আগাম বন্যার ভয়ের মধ্যে ছিলেন। হাওর এলাকার  কাঁচা ধান মণপ্রতি ৫ শ’ টাকা থেকে সাড়ে ৫ শ’ টাকা দরে বিক্রয় হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে লোকসান গুণছেন চাষীরা।