অবকাঠামো ও মানব উন্নয়ন খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট (পিআরআই)। আর সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে পে রোল ট্যাক্স (বেতনের উপর কর) আরোপ এবং বিড়ির উপর কর বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। গতকাল শনিবার পিআরআই আয়োজিত ‘৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে আগামী বাজেট’ শীর্ষক সেমিনারে এসব সুপারিশ করা হয়।
পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মনসুর এবং ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমদ পৃথক দু’টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, সাবেক সচিব সোহেল চৌধুরী এবং এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান আনিস এ খান প্রমুখ।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে অবকাঠামো ও মানব সম্পদ উন্নয়নে বড় ব্যয় করা প্রয়োজন। অর্থাত্ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই বড় বাজেট প্রণয়ন করা দরকার। এটাকে যারা উচ্চাভিলাষী বলবে তাদের জন্য আমার বক্তব্য হচ্ছে আমি উন্নয়নমূলক কাজে উচ্চ আশাই পোষণ করি। অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১২ লাখ মানুষ ট্যাক্স দেয়। এটা সত্যিই খুব লজ্জাজনক ও হতাশাজনক। অল্প হলেও সবারই কর দেয়া উচিত। অন্তত বাড়ির মালিকরা কর দিলেও এ সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। আবুল মাল আবদুল মুহিত আরও বলেন, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর (কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়) ১১টি ক্যামিকেল আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে লাইসেন্সিং এবং উচ্চ কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করব। টোবাকো খাতের কর নীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের টোবাকো কর নীতি খুব উন্নত নয়। বিড়ির উপর কর বসানোর মাধ্যমে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, পে রোল ট্যাক্সের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এ খাতেও বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় করা সম্ভব। এ বিষয়ে কাজ করা হবে। এছাড়া দেউলিয়া আইন (কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হলে তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া) এবং মার্জার এন্ড ইকুইজিশন (একাধিক কোম্পানি একীভূতকরণ) বিষয়ক আইন শক্তিশালীর কাজ শুরু করব।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদের রাজস্ব আয় বাড়লেও তা ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। রাজস্ব আদায়ে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিম্ন ভ্যাট এবং প্রত্যক্ষ কর আদায়। রাজস্ব আদায় বাড়াতে এক্ষেত্রে বড় সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে- কর প্রদানকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, করের উত্স বৃদ্ধি এবং আত্মকর্মসংস্থান কারীদেরকে করের আওতায় নিয়ে আসা। পাশাপাশি এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর প্রদানকে ডিজিটালাইজড করা দরকার। এছাড়া কর আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে সস্তা সিগারেট ও বিড়ির উপর কর আরোপ করা যেতে পারে। বস্ত্র খাতের কর হার বাড়ানো যেতে পারে। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. সাদিক আহমদ বলেন, ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে অবকাঠামো ও মানব উন্নয়ন খাতে বড় বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। জিডিপির অন্তত ২ শতাংশ অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা উচিত। আর মানব সম্পদ উন্নয়নে জিডিপির অন্তত ২.৬ শতাংশ ব্যয় করা উচিত। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে এ খাতে জিডিপির অন্তত ০.৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা দরকার। খরচ কমাতে লোকসানি কিছু প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, যেখানে দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক মুনাফা করছে সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে মূলধন সহায়তা দেয়ার কোন যুক্তি নেই।
ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগ বাড়িয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই এবারের বাজেটের চ্যালেঞ্জ। আর সাম্প্রতিক সময়ে এনবিআরের যে রাজস্ব আয় ধরা হচ্ছে তা সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। এ অবস্থায় এনবিআর বহির্ভূত আয় বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে ভ্যাট আরোপ করা হয় না। অন্যান্য দেশ কিভাবে এ ভ্যাট আদায় করছে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বছরের পর বছর ধরে মূলধন সহায়তা না দিয়ে এ ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি করা যেতে পারে।
ট্রেজারি হিসেবে শুধু সোনালী ব্যাংককে সরকারি রাখলেই হয়। সোহেল চৌধুরী বলেন, দেশের বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে স্থল ও নদী বন্দর উন্নত করা খুবই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে ২০০ বা ২৫০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দিয়ে কাজ করানো যেতে পারে। সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, কর আরোপের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তর থাকা প্রয়োজন। তবে এমনিতেই দেশে ব্যবসায়ের পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি, তাই কর আরোপে এ বিষয়টি ভাবতে হবে। আর অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের উপর জোর দেয়া প্রয়োজন। মানব উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া দরকার।
