শুরুতে দাবি করা হতো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু দালালদের প্রলোভনে পড়ে খুব কমসংখ্যক মানুষই প্রলুদ্ধ হতো। তারপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই সাগর পথে পৌঁছেছিল স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায়। আর এই ‘সফলতা’ দেখিয়ে দালালরা পরে বড় পরিসরে মানব পাচার শুরু করে। শেষটায় মানব পাচার হয়ে যায় এক অর্থে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের হাতিয়ার। এজন্য দালালরাই উল্টো নিজেরা পুঁজি বিনিয়োগ শুরু করে। গড়ে তুলে দেশব্যাপী শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে বলা হয়, ‘কক্সবাজার পর্যন্ত পৌঁছানোর টাকা জোগাড় করলেই চলবে। সব মিলিয়ে যানবাহনের ভাড়া বাবদ লাগবে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। বাকি টাকা পরে মালয়েশিয়া পৌঁছে চাকরি করে পরিশোধ করলেই হবে।’ দালালদের এই আকর্ষণীয় শর্তে অনেকেই সাড়া দেয়। এরপর শুরু হয় সাগরপথে যাত্রা। কিন্তু এদের অনেকেরই পরে ঠিকানা হয় থাইল্যান্ডে মুক্তিপণ আদায়কারীদের আস্তানা বা বন্দি শিবিরে, কারো বা ট্রলারডুবিতে মৃত্যু হয়। মালয়েশিয়া যাবার স্বপ্ন তাদের আর কোনদিনই পূরণ হয় না।
কক্সবাজারে কর্মরত গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ একাধিক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, দালালরা প্রথমে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নামের তালিকা তৈরি করে। যাত্রার দিন প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দেয় একটি মোবাইল ফোন নম্বর। মালয়েশিয়াগামী এসব লোকজন প্রথমে জড়ো হন চট্টগ্রাম রেল স্টেশন বা বাস টার্মিনালে। চট্টগ্রামে অবস্থানকারী দালালরা সবাইকে এক সঙ্গে জড়ো করে কিছু নির্দেশনা দেয়। এরপর বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায়। সেখানে তাদেরকে গ্রহণ করে দালাল চক্রের অন্য টিম। এক বা দুই দিন কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করার পর সুযোগ বুঝে গভীর রাতে তাদের তুলে দেয়া হয় ছোট ট্রলারে। প্রতিটি ট্রলারে উঠানো হয় ১৫ থেকে ২৫ জন করে। পরে তাদের তুলে দেয়া হয় গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ বড় ট্রলারে। আর বড় ট্রলারে তুলে দেয়ার পর মাথাপিছু ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বড় ট্রলারে অবস্থানকারী দালালদের কাছ থেকে বুঝে নেয় ছোট ট্রলারে থাকা দালালরা। এভাবেই সাগরপথে পাচারের উদ্দেশ্যে বিক্রি হয়ে যান অভিবাসন প্রত্যাশীরা ।
পাচারের শিকার শামিম আহমেদ নামের এক যুবকের বরাত দিয়ে সিআইডির একজন কর্মকর্তা বলেন, নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজারের বাসিন্দা শামীম। পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মালয়েশিয়া নেয়ার কথা বলে গত বছর জুন মাসে পাচার করা হয় তাকে। টেকনাফে ট্রলারে ওঠার আধা ঘন্টা পর দালাররা তাদের ছয় জনকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে মাছের ড্রামে বিশেষ কায়দায় রেখে দেয়। বাকিরা জেলে সেজে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয়। শামীম জানিয়েছে, যাদের অজ্ঞান করে ড্রামে ভরা হয়েছিলো তারা টাকা কম দিয়েছিল। পরে সবাইকে মাঝ সমুদ্রে একটি মাছ ধরার বড় ট্রলারে উঠানো হয়। দালাল চক্র ৪০ জনের চালানটি ট্রলারে উঠিয়ে দিয়ে নিজেরা টেকনাফে ফিরে যায়।
শামিমের ভাষ্য, গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পরপরই ট্রলারটিকে টালমাটাল মনে হচ্ছিল। আমাদের গন্তব্য ছিল থাইল্যান্ড। জঙ্গল দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে সীমান্ত পেরিয়ে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেয়ার কথা। সেখানে স্থানীয় এজেন্ট তাদের রিসিভ করে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে চাকরিতে প্রবেশ করানোর শর্ত পূরণ করবে। যখন এই কথা ভাবছিলাম হঠাত্ করেই সবকিছু উল্টে গেলো। তীব্র ঢেউয়ের আঘাতে চোখের সামনে ট্রলারটি ডুবে যায়। আমি ড্রাম আকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। তিন দিন তিন রাত সাগরে ভাসার পর বাংলাদেশের কোষ্ট গার্ড আমাকে উদ্ধার করে।
কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান আবুল হোসেন জানান, তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর কয়েক দফায় উদ্ধার করেছেন পাচার হওয়া তিন শতাধিক ব্যক্তিকে। গ্রেফতার করেছেন ট্রলার মাঝিসহ ২৬ জন দালালকে। জবানবন্দি নিয়েছেন পাচারের কবল থেকে উদ্ধার হওয়া লোকজন ও দালালদের।
পুলিশের এ কর্মকর্তা গতকাল রবিবার বিকালে ফোনে এ প্রতিদেককে বলেন, তিনি যাদেরকে উদ্ধার করেছেন তারা সবাই নিন্মআয়ের মানুষ। তাদেরকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো করা হয়েছিল। তাদের অনেকেরই ২ হাজার টাকাও দেয়ার সঙ্গতি নেই। এলাকা ভিত্তিক দালালরা তাদেরকে জানিয়েছেল, টাকার জন্য চিন্তা করতে হবে না। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাবে স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায়। সেখানে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও কোন সমস্যা হবেনা। আর চাকরি পাওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বাকি টাকা (বলা হতো সবমিলিয়ে ২ থেকে তিন লাখ) পরিশোধ করতে হবে।
পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরো বলেন, আসলে দালালদের উদ্দেশ্য মালয়েশিয়া পাঠানো না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল থাইল্যান্ডে নিয়ে জঙ্গলে আটক করা এবং মুক্তিপণ আদায় করা। আর এ মুক্তিপণ আদায়ের টাকা সংগ্রহ করতো এলাকা ভিত্তিক দালালরা। এজন্য তারা পেত মোটা অংকের কমিশন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ৩৮টি জেলার ৫৫টি স্থান থেকে গত বছর ২০ হাজার মানুষ থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া পাচার হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি (স্পোশাল ক্রাইম ও প্রটোকশন) জহিরুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেছেন, সমুদ্র পথে মানব পাচার বন্ধে পুলিশ নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে উখিয়া থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে ৪৫টি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন থানার অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম খান ।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মালয়েশিয়া সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশে পাহাড়ি জঙ্গলে বন্দি শিবিরের খোঁজ পায় পুলিশ। গত ১ মে একটি গণকবর থেকে ২৬ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। এই বন্দিশিবিরে পাচার বা অপহরণের শিকার হওয়া পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে মেরে ফেলা হয়ে থাকতে পারে বলে বেঁচে যাওয়া একজনের বরাত দিয়ে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। আর বন্দিদের অধিকাংশই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি।
