কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার শীর্ষ মানব পাচারকারী জাফর আলম ওরফে জাফর মাঝি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। ঐ বন্দুক যুদ্ধে দুই পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছে। জাফর মাঝি নিহত হওয়ায় উখিয়া উপজেলার গ্রাম, পাড়া-মহল্লার নারী-পুরুষ মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সাধারণ নৌকার শ্রমিক থেকে জাফর মাঝি শীর্ষ মানব পাচারকারী হওয়ার নেপথ্যে বের হয়ে পড়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুধু শীর্ষ মানব পাচারকারী নয়, জাফর উখিয়ার ঘরে ঘরে মানব পাচারকারির জন্মদাতা। পাশাপাশি অপরাধ জগতে সে ইয়াবা পাচারের অন্যতম নেতা। গ্রামবাসিদের চোখের সামনে দিয়ে কিভাবে জাফর মাঝি ও তার সহযোগীরা সমুদ্র পথে মানবপাচার করতো, তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লোমহর্ষক কাহিনী গ্রামবাসি পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে প্রকাশ করেছে।
২০১২ সাল থেকে জাফর মাঝি ব্যাপকভাবে মানবপাচার শুরু করে। এলাকাবাসি জানান, সারাদেশ থেকে দালালদের মাধ্যমে নারী-পুরুষদের সংগ্রহ করে উখিয়া সমুদ্র সৈকত এলাকায় জাফর মাঝির আধাপাকা ঘরে এনে রাখা হতো। সুযোগ বুঝে রাতে জাফর মাঝি নৌযানযোগে এসকল নারী-পুরুষদের সমুদ্রপথে পাচার করতো। সমুদ্র সৈকত এলাকায় তার বেশ কয়েকটি আধাপাকা ঘর রয়েছে। এসব ঘরে আত্মীয়-স্বজন থাকলেও আসলে তারা মানব পাচারে জড়িত। সমুদ্রপথে মানব পাচারের জন্য জাফর মাঝির রয়েছে ৫ থেকে ১০টি নৌযান। স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসি সূত্রে জানা যায়, গত ৩ বছরে জাফর মাঝি দুই সহস াধিক লোককে সমুদ্র পথে বিদেশে চাকরি দেয়ার কথা বলে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে ২৫০ জনের কোন হদিস আজও পাওয়া যায়নি। তারা না খেয়ে ও শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছেন বলে এলাকাবাসির দাবি। নিখোঁজ ব্যক্তিরা উখিয়া উপজেলার বাসিন্দা। ইতিপূর্বে জাফর মাঝি গ্রেফতার হলেও সহজে জামিনে বের হয়ে আসে। শুরু করেন মানব পাচার।
জানা গেছে, উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের পশ্চিম সোনারপাড়া গ্রামের জহির আহমদের ছেলে জাফর আলম ওরফে জাফর মাঝি শনিবার রাত ২টার দিকে সাগরপথে পাচারের জন্য মেরিন ড্রাইভের পার্শ্বস্থ সোনারপাড়া সৈকত এলাকায় মানব পাচারকারীদের আস্তানা ঝুঁপড়ি ঘরে অবস্থান করছিলো। গোপন সূত্রের সংবাদের ভিত্তিতে কক্সবাজার ডিবি পুলিশের একটি দল ওই এলাকায় হানা দিলে মানব পাচারকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি বর্ষণ করলে জাফর মাঝি গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। এ সময় দুর্বৃত্তদের গুলিতে ডিবি পুলিশের কনস্টেবল হালিম (২৭) ও আনসার সদস্য মনিরুল ইসলাম (৩০) আহত হয়। গুলিবিদ্ধ জাফর মাঝিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত ২ কনস্টেবলকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কক্সবাজার ডিবি পুলিশের ওসি দেওয়ান আবুল হোছন জানান, ঘটনাস্থলে পাচারকারীরা প্রায় ১১ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। জবাবে পুলিশও ১৫ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী গুলি পাল্টা-গুলি বর্ষণের ঘটনায় অন্যান্য পাচারকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। নিহত জাফর মাঝির বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় একটি মানব পাচার মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
যেভাবে জাফর মাঝির উত্থান : মানব পাচারকারীর টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে পরিচিত জাফর মাঝিরা ৫ ভাই ৩ বোনের মধ্যে মাঝি সবার বড়। স্থানীয়রা জানান, সে শৈশব থেকে বিভিন্ন মাছ ধরার নৌকার শ্রমিক হিসাবে কাজ করে আসছিল। মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন বসত বাড়ি হওয়ার সুবাদে নানা রকম অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। ২০১২ সালে উপকূলীয় এলাকা দিয়ে ব্যাপকহারে মানব পাচার শুরু হলে সে মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের জড়ো করে তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে সুযোগ বুঝে সাগরপথে পাচার করে আসছে। এভাবে সে ফিশিং বোটের মাঝি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে তার একাধিক ফিশিং বোটসহ কোটি কোটি টাকার স্বনামে বেনামে সহায় সম্পত্তি রয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। মিয়ানমার থেকে সাগরপথে যেসব ইয়াবার চালান আসে ওই সব ইয়াবা তার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চালান হয়ে আসছে বলে দাবি করেন স্থানীয় গ্রামবাসী। তার অনৈতিক ব্যবসার শিকার হয়ে শত শত যুবক এখন ইয়াবা আসক্ত হয়ে পড়েছে। উপকূলের সোনারপাড়া হতে মনখালী পর্যন্ত ৩০ কি:মি সৈকত এলাকায় অন্তত ১৩টি পয়েন্ট দিয়ে মানব পাচারের যাবতীয় পদ্ধতি এই জাফর মাঝি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল।
জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদে মানব পাচার প্রতিরোধের বৈঠক: পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে এলাকার শীর্ষ মানব পাচারকারী, একাধিক মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি জাফর মাঝি নিহত হওয়ার ঘটনায় তাত্ক্ষণিকভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি পুলিশ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। গতকাল রবিবার সকাল ১০টায় জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ সম্মেলন কক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জালিয়াপালং ইউনিয়ন কমিউনিটি পুলিশের সভাপতি শহীদুল্লাহ কায়ছার বলেন, জাফর মাঝির উত্থানের ফলে উপকূলীয় এলাকার ঘরে ঘরে মানব পাচারকারীর জন্ম হয়েছে। যে কারণে সারা দেশে জালিয়াপালং ইউনিয়নবাসিকে কলংকের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, এলাকার কতিপয় জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি পুলিশের সদস্য ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মানব পাচারের সাথে জড়িত রয়েছেন। কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে মানব পাচারকারীদের এলাকা থেকে উত্খাত করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। সভায় ৯ ওয়ার্ডের ১৮ জন কমিউনিটি পুলিশের সভাপতি সম্পাদক মানব পাচার প্রতিরোধের শপথ গ্রহণ করে এলাকাভিত্তিক মানব পাচার প্রতিরোধে সর্বসাধারণকে উদ্ভূদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। কমিউনিটি পুলিশের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহমদ জানান, জালিয়াপালং ইউনিয়নের জুম্মাপাড়া এলাকায় উত্থান হওয়া ছানা উল্লাহ মানব পাচার করে ৫/৬টি ফিশিং বোটের মালিক হয়েছেন। এছাড়াও মানব পাচার করে শতাধিক বসতভিটা হাতিয়ে নিয়েছেন। কোটি কোটি টাকার সহায় সম্পত্তির মালিক এই ছানা উল্লাহ বর্তমানে চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন। তিনি পুলিশ প্রশাসনের প্রতি জোরালে দাবি জানিয়ে বলেন, ছানা উল্লাহকে গ্রেফতার করা না হলে মানব পাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
