বিএনপিকে কঠোর আন্দোলন উপযোগী এবং সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল অবধি হবে এই পুনর্গঠন কাজ। ইতিমধ্যে আন্দোলনে ‘অসফলতার’ কারণগুলো চিহ্নিত করেছেন তিনি। দলের সাংগঠনিক কমিটিগুলোকে পুনর্বিন্যাস এবং দুর্বল কমিটিগুলোকে ভেঙে দিয়ে ‘আন্দোলন কমিটি’ করার কাজে হাত দিয়েছেন। গত তিন মাসের আন্দোলনে যারা শত প্রতিকূলতার ভেতরও সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন তাদেরকে পুরোভাগে আনা হবে। মূলত নেতৃত্বে আসছেন ‘আন্দোলনে সাহসী’ তরুণরা। ইতিমধ্যে বেগম জিয়া তার গুলশান কার্যালয়ে কর্মরত নেতাদের রদবদল করেছেন। দফতরের কাজের দায়িত্বে পুনর্বিন্যাস করেছেন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে.জেনারেল অব.মাহবুবুর রহমান। ফখরুল কারামুক্ত হলেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে। দলের একটি সূত্র জানায়, মির্জা ফখরুলকে দলের একটি অংশ পছন্দ না করলেও বেগম জিয়া তাকে মহাসচিব হিসাবে পছন্দ করেন। তিনি মনে করেন ফখরুল পরীক্ষিত। মির্জা ফখরুল গত ৫ জানুয়ারি সরকার বিরোধী আন্দোলন অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে সংবাদ সম্মেলনের কয়েক মিনিট পরেই জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। এই অবস্থায় তার প্রতি দলীয় হাইকমান্ডের সমবেদনা রয়েছে। ২০১১ সালে ১৬ মার্চ মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর থেকে মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে ঢাকা মহানগর বিএনপির কাঠামো ভাঙ্গা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর কমিটি হবে দুইভাগে বিভক্ত। উত্তর ও দক্ষিণ। নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে এনে ‘আন্দোলন কমিটি’ হবে।
বেগম খালেদা জিয়া গত কয়েকদিন দলের পেশাজীবী এবং আইনজীবীদের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময়ের সময় বলেন, ‘অনেক দিন হয়ে গেল বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির। এখন আমাদের পুনর্গঠনের দিকেই যেতে হবে। আমি এ প্রক্রিয়ার কিছু কিছু কাজ শুরু করেছি। যারা ভাল কাজ করবেন, যাদের ত্যাগ আছে, তাদের দলের মধ্যে অবস্থান তৈরি করে দেয়া হবে।
লে.জেনারেল অব.মাহবুবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, সামনের দিনগুলোতে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বিএনপিকে। দলে পরিবর্তন আনা খুবই প্রয়োজন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রিজভীসহ দলের শীর্ষ নেতারা মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সম্পূর্ণভাবে কাজ করবেন। তিনি বলেন, নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য জাতীয় কাউন্সিল হবে। দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিল হচ্ছে না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা মুক্তি পাওয়ার পর চূড়ান্ত কাউন্সিল হবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ বলেন, আন্দোলনের সফলতা-ব্যর্থতার মূল্যায়ন পেয়েছি আমরা। দল যত শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত থাকবে ততই আন্দোলনের মাঠে সাফল্য আসবে। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আহমদ আযম খান বলেন, আমার কাছে যে তথ্য রয়েছে, তাতে সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থেকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয় সামাল দিতে দলের যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের পরে উপযুক্ত আর কাউকে পাওয়া না যাওয়ার প্রেক্ষিতে সহ-দপ্তর সম্পাদক কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীমকে গুলশান কার্যালয় থেকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে। দলের সহ-প্রচার সম্পাদক সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্সকে গুরুত্বপূর্ণ কাজে দায়িত্ব দেয়া হতে পারে।
অবিলম্বে রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান খালেদা জিয়ার
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গতকাল এক বিবৃতিতে রাজনৈতিক সহাবস্থান ও সুস্থ স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ অবিলম্বে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারপ্র্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটি সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সহ-সভাপতি শমসের মোবিন চৌধুরী, বীর বিক্রম, যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ, আমার উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ মান্নান, শামসুজ্জামান দুদু ও মোসাদ্দেক আলী, বিএনপি নেতা লুত্ফুজ্জামান বাবর, আসলাম চৌধুরী, আবদুস সালাম পিন্টু ও আরিফুল হক চৌধুরীসহ বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলের বহু নেতা-কর্মী দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। এরা অনেকেই জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী এবং নিজ নিজ অঙ্গনে খ্যাতিমান ব্যক্তি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত বিরোধীদলকে দমনের হীন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মিথ্যা ফৌজদারী মামলায় বিনাবিচারে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
খালেদা জিয়া বলেন, এই পরিস্থিতিতে আমি দাবি করছি, বিএনপিসহ বিরোধী দলমতের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মিথ্যা মামলাসমূহ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে তাদেরকে মুক্তি দেয়া হোক। বিশেষ করে আমি অসুস্থ সিনিয়র নেতাদের মুক্তি ত্বরান্বিত করার দাবি করছি। একই সঙ্গে আহ্বান জানাচ্ছি রাজনৈতিক সহাবস্থান ও সুস্থ স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ অবিলম্বে ফিরিয়ে আনার।