লক্ষ কোটি টাকার এডিপি গুরুত্ব পরিবহন ও বিদ্যুতে

আপডেট : ১৪ মে ২০১৫, ২৩:৫৩

আগামী       ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য ৯৭ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। এর বাইরে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে তিন হাজার ৯৯৭ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প থাকছে। অর্থাত্ উন্নয়ন কাজে মোট ব্যয়ের লক্ষ্য এক লাখ ৯৯৭ কোটি টাকা। গতকাল এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়।

 
স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়ন বাদে মোট ৯৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রা ৬২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য ৩৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সভায় পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়। সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চাহিদার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী অতিরিক্ত চার হাজার ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেন।
 
বিদ্যুত্ বিভাগ অতিরিক্ত আরো এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে এটা তাদের দেয়া হবে। এছাড়া যোগাযোগ মন্ত্রণালয় আরো ৮০০ কোটি টাকা এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়েছে বলে মুস্তফা কামাল জানান।
 
সভা সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সফটওয়্যার শিল্প ও তথ্য প্রযুক্তি সেবা বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব থাকছে। এজন্য আইসিটি খাতে বরাদ্দ থাকছে ২ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। সেই সাথে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প যেমন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, পুনর্বাসন, দারিদ্র্য নিরসনে সরাসারি সহায়ক, মানব সম্পদ উন্নয়ন ও অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতসমূহের প্রকল্পকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। উন্নয়নের মূল ধারায় জলবায়ু পরিবর্তনকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বিশেষ কার্যক্রমে অগ্রাধিকার থাকছে। সম্পদের সীমাবদ্ধতায় নতুন প্রকল্পের চেয়ে চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করার বিশেষ গুরুত্ব থাকছে। সেই সাথে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) প্রকল্প পাবে অগ্রাধিকার।
 
সভা শেষে জানানো হয়, পদ্মা সেতুর গুরুত্ব বিবেচনায় পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুর বরাদ্দ থাকছে ৭ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে বিদ্যুত্ খাত। ভৌত পরিকল্পনা-পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাতে তৃতীয়, শিক্ষা ও ধর্ম খাতে চতুর্থ এবং স্বাস্থ্য-পুষ্টি-জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে পঞ্চম সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়।
 
আগামী অর্থবছরের এডিপিতে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা অথবা কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন  প্রকল্প বাদে বরাদ্দসহ অন্তর্ভুক্ত মোট প্রকল্প সংখ্যা ৯৯৮টি। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৮৫৪টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১৩২টি, জেডিসিএফ অর্থায়িত প্রকল্প ১২টি। এছাড়াও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ১২৫টি প্রকল্প রয়েছে। এবারের এডিপিতে বরাদ্দ ছাড়া অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের সংখ্যা ৮৫৭টি।
 
অপরদিকে, এডিপিতে বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে বরাদ্দ ছাড়া অননুমোদিত নতুন প্রকল্প হলো ৩৬৮টি। চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও যে সব প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না এমন মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্পকে তারকা চিহ্ন দিয়ে এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মেয়াদকাল বৃদ্ধি ছাড়া অর্থছাড় ও ব্যয় করা সম্ভব নয়। এডিপিতে এরকম প্রকল্পের সংখ্যা ২০৯টি।
 
আগামী অর্থবছরের এডিপিতে সম্ভাব্য সমাপ্য প্রকল্পের সংখ্যা ৩২৪টি। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ২৮১টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ৪১টি, জেডিসিএফ (জাপান ঋণ মওকুফ তহবিল) অর্থায়িত প্রকল্প দুটি। এডিপিতে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) প্রকল্প সংখ্যা ৪০টি। চলতি (২০১৪-১৫) অর্থবছরের এডিপির আকার ছিল ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
 
সর্বোচ্চ বরাদ্দ পরিবহন খাতে
 
খাত ভিত্তিক বরাদ্দ বিভাজনে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেলো পরিবহন খাত ২১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এর পরেই রয়েছে বিদ্যুত্ খাত। এ খাতে সব মিলিয়ে ১৬ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা, তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাতে ১০ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা,  শিক্ষার প্রসার ও গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা ও ধর্ম খাতে চতুর্থ সর্বোচ্চ মোট ১০ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়ন ও অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে মোট ৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে মোট ৬ হাজার ৮১ কোটি টাকা এবং কৃষি খাতে ৪ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে।
 
এনইসি সভাশেষে পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে যে চাহিদা থাকবে সরকার তা মেটাবে। তবে এক্ষেত্রে আমাদের দক্ষতার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। বার বার প্রকল্প সংশোধন করা যাবে না। আমি এমনটা দেখেছি কিছু প্রকল্প আছে যেটা ৫ ভাগ কাজ হলে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু প্রকল্প পরিচালক সে কাজ শেষ না করে অযথা সময় বৃদ্ধির আবেদন করে। এটা করার মূল কারণ প্রকল্প থেকে বাড়তি সুবিধা ভোগ করা। এতে সরকারি অর্থ অপচয় হয়। একজন প্রকল্প পরিচালককে একের অধিক প্রকল্প যাতে দেয়া না হয় সেটা নিশ্চিত করবো।
 
প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫১ ভাগ
 
বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১৪ মার্কিন ডলারে যা গত বছরে ছিল ১১৯০ ডলার। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি পৃথিবীতে ৫৮তম। অপরদিকে ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে আমাদের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৯ মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি (মোট দেশজ উত্পাদন) প্রবৃৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৫১ ভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসেবে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে এনইসি বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এ তথ্য জানান।
 
মন্ত্রী বলেন, মোট জিডিপির মধ্যে কৃষি খাতের অবদান ১৫ দশমিক ৫৯ ভাগ, শিল্প খাতের অবদান ২৭ দশমিক ৯৮ ভাগ এবং সেবা খাতের অবদান ৫৬ দশমিক ৪২ ভাগ। গত বছর এ তিনটি খাতের অবদান ছিল যথাক্রমে কৃষিতে ১৬ দশমিক ১১ ভাগ, শিল্পে ২৭ দশমিক ৭১ ভাগ এবং সেবা খাতে ৫৬ দশমিক ১৮ ভাগ।
 
এ বছর এ তিনটি খাতে প্রবৃদ্ধির হার যথাক্রমে কৃষিতে ৩ দশমিক শূন্য ৪ ভাগ, শিল্পে ৯ দশমিক ৬০ ভাগ এবং সেবা খাতে ৫ দশমিক ৮৩ ভাগ। গত বছর প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে কৃষিতে ৪ দশমিক ৩৭ ভাগ, শিল্পে ৮ দশমিক ১৪ ভাগ এবং সেবায় ৫ দশমিক ৬২ ভাগ।
 
জিডিপির আকার চলতি মূল্যে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকায়। গতবছর ছিল ১৩ লাখ ৪৩ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। এনইসি সভায় জানানো হয়, বর্তমানে দেশে জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগ হার ২৮ দশমিক ৯৯ ভাগ। এরমধ্যে সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৬ ভাগ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ২২ দশমিক ৩৯ ভাগ। গত বছর জিডিপির তুলনায় মোট বিনিয়োগ ছিল ২৮ দশমিক ৫৮ ভাগ।
 
চলতি অর্থবছরের শুরুতে বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিলো ৭ দশমিক ৩ ভাগ। চলতি অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অনুমান হলো প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৬ ভাগ। অপরদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিপি) অনুমান হচ্ছে ৬ দশমিক ১ ভাগ। গত জানুযারি মাস থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরতাল অবরোধে জিডিপির কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি হবে না বলে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীরা আশংকা করেছে।
 
এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, ‘আশা করা হয়েছিলো এ বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হবে। প্রথম ছয় মাস ঠিক ছিল। পরবর্তীতে জ্বালাও পোড়াও রাজনীতির কারণে আমরা তা অর্জন করতে পারিনি। এর পরেও ৬ দশামিক ৫১ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন কম নয়।’
 
প্রতি অর্থবছরের শেষ দিকের ৯ মাসের তথ্যের ভিত্তিতে বিবিএস প্রবৃদ্ধির সাময়িক হিসেব করে থাকে। সেই সাথে আগের বছরের চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধির হিসেব দিয়ে থাকে। বিবিএসএর তথ্যানুযায়ী গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। গতবছর সাময়িক হিসেব অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির এ হার ছিলো ৬ দশমিক ১২ শতাংশ। মূলত পরোক্ষ পদ্ধতিতে মূল্য সংযোজনের তথ্য নিয়ে বিবিএস প্রবৃদ্ধির হিসেব করে থাকে।