ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আসন্ন বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে। আগামী ৬ জুন তার দু’দিনের সফরে ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর এটাই প্রথম বাংলাদেশ সফর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে মোদীর এই সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানা গেছে। তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এখন এই চুক্তি সম্পাদনের আগে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইছে না।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ সফর এবং সম্প্রতি কলকাতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মমতার বৈঠকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ ও তিস্তা চুক্তির বিষয়ে আলোচনা আশার আলো ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে দুটি বড় প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য ভারতের ওপর চাপ রয়েছে তার একটি হল সীমান্ত চুক্তি যা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই ভারতের সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। অপরটি তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তা চুক্তি সই করার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বিরোধিতা ও শেষ মুহূর্তে আপত্তি তুলে মনমোহনের সফরসঙ্গীর তালিকা থেকে তার নাম প্রত্যাহার করায় তখন তিস্তা চুক্তি হয়নি।
২০১১ সালে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আগে ঢাকা ও দিল্লি তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়ে একমতে পৌঁছেছিল। তিস্তার পানির ২০ শতাংশ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য ছেড়ে দিয়ে ৪০ঃ৪০ অর্থাত্ অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ ও ভারত সমান ভাগ করে নেবে বলে চূড়ান্ত হয়েছিল। এদিকে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও যৌথ নদী কমিশন সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটা এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার।
এদিকে, তিস্তা চুক্তি না হওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পানি প্রবাহ কমে আসায় প্রতিবছর কৃষি কাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর উজান ও ভাটিতে জেগে উঠেছে ধু-ধু বালুচর। দেশের সর্ববৃহত্ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ চরম পানি সংকটে ব্যাহত হয় সেচ কাজ। ঐতিহাসিক ভাবে শুষ্ক মৌসুম অর্থাত্ মার্চ-এপ্রিল মাসে তিস্তায় প্রবাহ থাকে ৫ হাজার ৮৮৭ কিউসেক। সেখানে এ বছর ১১ মার্চ পানি প্রবাহ ছিল ৩৫০ কিউসেক, যা ছিল এ যাবত্কালের সর্বনিম্ন প্রবাহ। গত বছর ফেব্রুয়ারি - মার্চ মাসে পানি প্রবাহের গড় ছিল ৫৫৩ কিউসেক। এদিকে ২০১৩ সাল এবং তার আগের বছরগুলোতে একইসময়ে পানি প্রবাহ ছিল ২৪০০ কিউসেক থেকে ৩৫০০ কিউসেক। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজান থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণেই এমনটা হচ্ছে। এর ফলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের কৃষকরা।
এদিকে, কলকাতা সফরে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে তিস্তার ইস্যুতে আলোচনা করেছেন নরেন্দ্র মোদী। মমতা এ সময় তিস্তার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের মধ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব করেন। মোদি এ প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন। তিস্তা চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করে ঢাকায় আসতে চান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মোদী তার ঢাকা সফরকালে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে আসতে আগ্রহী। এমন হলে মমতা ব্যানার্জিও মোদীর সঙ্গে ঢাকায় আসতে পারেন।
এদিকে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, তিস্তা চুক্তি করা হবে। কিন্তু তা হবে দেশের অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পর। মমতা ব্যানার্জিও বাংলাদেশ সফরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। হাসিনাদির সঙ্গে আলাপ করে তিস্তা সমস্যার সমাধান করব।’ সর্বশেষ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ভারতের লোকসভায় সীমান্ত চুক্তির বিল উত্থাপন করে বলেছেন, সীমান্ত সমস্যার সমাধানের পর তিস্তার সমস্যার সমাধান করাও কোন কঠিন কাজ হবে না।
