বিচার বিভাগ পৃথককরণ সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার রায় উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা বলেছেন, ‘মাসদার হোসেন মামলার ১২ দফা নির্দেশনার মধ্যে যেটা প্রধান, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেটা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিম্ন আদালতের প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ সেটা হাইকোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধি ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থা গ্রহণ যদি সরকারের হাতে থাকে তাহলে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তো হাইকোর্টের হাতে থাকল না।’
গতকাল শনিবার ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বার ও বেঞ্চের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ এই সেমিনারের আয়োজন করে।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ের ১৪ বছর হয়ে গেল, আদৌও কি পেলাম এই প্রশ্ন রেখে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি বলবো বিচার বিভাগের প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন করতে চাই, তাহলে সংবিধানে যা আছে, সংবিধানের ১১৬ এর সঙ্গে যদি ১০৯ পড়ি, তাহলে প্রকৃতপক্ষে ১১৬ কি বলে তার অর্থ পাওয়া যাবে। মাসদার হোসেনের রায়ে পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, অর্জিনাল ১১৬ যদি পুন:স্থাপন না করা হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনদিনই থাকবে না। বিশেষ করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের।’
সংগঠনের সভাপতি এডভোকেট মনজিল মোরসেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন- সাবেক বিচারপতি আওলাদ আলী, সাবেক বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ন, সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের আহবায়ক আব্দুল বাসেত মজুমদার প্রমুখ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বার ও বেঞ্চের সম্পর্ক উন্নয়নে কয়েক দফা প্রস্তাব তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার মঈন ফিরোজী।
প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা বলেন, আইনজীবীদের ত্রুটির কারণে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মামলায় বিচারপ্রার্থীরা হেরে যান। আমরা প্রতিদিনই কয়েকশ’ মামলা তালিকায় পাই। অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে বিশেষ করে উচ্চ আদালতে বিচারকের আশা থাকে আপনারা পড়াশোনা করে আসবেন। একজন বিচারক হাত দেয়ার সাথে সাথে পয়েন্ট (যুক্তি) কি প্রশ্ন করলে আপনারা সঠিক উত্তর দিতে পারেন না। আপনি আইনজীবী হিসেবে আপনার মক্কেলের কাছ থেকে ফিস নিয়েছেন। মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনজীবীদের সচেতনতা দেখা যায় না। এ সময় তিনি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নানা ধরনের বাধার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বিচার বিভাগের গঠনমূলক সমালোচনা করারও আহবান জানিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বার ও বেঞ্চের ভূমিকার ব্যাপারে আমি বলবো, বেঞ্চ কী ভূমিকা নেবে সেটা নির্ভর করে আইনজীবীদের ওপরে। আইনজীবীরা হলেন, প্রত্যেকেই এক একটা আর্কিটেক্ট। আমি বলবো কারিগর। একটা বিল্ডিং তৈরি করতে প্রথমে একটা আর্কিটেক্ট ডিজাইন করেন। তারা যে প্ল্যান করেন সেটার ওপর একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বাকি জিনিসগুলো বসিয়ে দেন। মামলার বিচারের প্রথম আর্কিটেক্ট হলো আইনজীবীরা। একজন আইনজীবী হিসেবে আমাকে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে, আমি কতদূর আমার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সারাদেশে প্রায় ২৮ লাখ ৩০ হাজার মামলা বিচারাধীন। এত লক্ষ লক্ষ মামলা বিচারাধীন থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয় না। আমি বিচারকদের ডাকলাম, আপনারা কোর্টে ওঠেন না বিচার করেন না, ডাইরিতে লেখেন না। ওনারা (বিচারকরা) একে একে বললেন, আমরা সময়ের দরখাস্ত না মঞ্জুর করলে উনারা (আইনজীবীরা) রূঢ় ব্যবহার করেন, লাঞ্চের (দুপুরের খাবারের) পর উনারা কোর্টে থাকেন না। বিচারপ্রার্থীরা কোর্টে চলে আসে, সে জানে না মহুরিকে দিয়ে মামলা ফাইল করে দেন। পরে মুলতবির জন্য বলেন। এটা বছরের পর বছর চলে। আমি বিচারকদের বলে দিলাম না আসলে মামলা খারিজ করে দেবেন। এখন আইন সংশোধন হয়েছে, খারিজ করলে পরের দিন এক হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে তারা আবেদন দিলে তা আবার চলে।
প্রধান বিচারপতি গণমাধ্যমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বিচার বিভাগ স্পর্শকাতর বিভাগ, সেখানে বেফাস মন্তব্য করতে আপনারা বিরত থাকেন। আমরা চাই আপনারা লেখেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আপনাদের লেখনীর দরকার। কিন্তু কি লেখবেন। যে বিষয়ে লেখবেন, সে বিষয়ে লেখাপড়া করতে হবে। জানতে হবে। বিষয়বস্তুর গভীরে যেতে হবে। না জেনে পাণ্ডিত্য করবেন না। যাতে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের যে আস্থা সেটা ভেঙ্গে না পড়ে।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা সমালোচনার বাহিরে না। কিন্তু গঠনমূলক সমালোচনা করুন।’
আইনের শাসন সম্পর্কে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আইনের শাসন মানে আমি যে দায়িত্বে আছি আগে আমাকে আমার কতর্ব্যের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। আমি আমার দায়িত্ব পালন করবো। তারপর আমি আপনাকে বলবো আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করুন। সরকারকে বলবো তখন আপনারা পালন করেন। নির্বাচন কমিশনকে বলবো আইনের শাসন পালন করে নির্বাচনটা নিরপেক্ষ করেন। আমি যদি আইনের শাসন নিজে পালন না করি তাহলে অন্যকে কিভাবে বলবো আপনারা পালন করুন। সেজন্যই আইনজীবীরা আপনারা নিজে আগে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর বিচারককে বলেন, বিচারকরা অবশ্যই পালন করবে।’