৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে ১৯৯৫ সালের আইনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানিকগঞ্জের সেই শুকুর আলীর মৃত্যুদণ্ড শেষ পর্যন্ত বহালই রইলো। যদিও শুকুর আলীকে যে আইনে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সেই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা অবৈধ ঘোষণা করেছে। আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী ২০০০ সালের আগে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধের মামলাগুলোর বিচার হবে ১৯৯৫ সালের আইনে। কিন্তু আদালতকে দণ্ড দিতে হবে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিধান অনুযায়ী। শুকুর আলীর বিচার এবং দণ্ড দুটিই হয়েছিলো ৯৫ সালের আইন অনুযায়ী। ওই আইনে ধর্ষণের কারণে কারো মৃত্যু ঘটলে অপরাধীর শাস্তি কেবলই ছিলো মৃত্যুদণ্ড। বর্তমান আইনে বিচারক চাইলে যাবজ্জীবন দণ্ডও দিতে পারেন। শুকুর আলী এবং মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ৯৫ সালের আইনে দণ্ডদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছিলো। তাতে শুকুর আলীর জয় হলেও মৃত্যুদণ্ড থেকে তিনি রেহাই পাননি।
মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার শিবরামপুর গ্রামে শুকুর আলী নামে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে। ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৬ সালের ১১ জুন। আইনানুযায়ী কিশোর শুকুর আলীর বিচার হওয়ার কথা ছিলো কিশোর আদালতে। কিন্তু শিবালয় থানা পুলিশ নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ১৯৯৫ এর আওতায় মামলাটি বিচারের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পাঠায়। মানিকগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৬(২) ধারায় নিম্ন আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন। সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ২০০১ সালের ১২ জুলাই নিম্ন আদালত শুকুর আলীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ট্রাইব্যুনাল যখন শুকুর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় তার এক বছর আগেই জাতীয় সংসদ ১৯৯৫ সালের আইনটি বাতিল করে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন নামে আরেকটি আইন প্রণয়ন করে। ওই আইনে ধর্ষণের ফলে বা ধর্ষণের পর কাউকে হত্যা করা হলে তার শাস্তির বিধান রাখে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু শুকুর আলীর বিচার হয় ৯৫ সালের পুরনো আইনে। যার উক্ত অপরাধের শাস্তির বিধান ছিলো কেবল মৃত্যুদণ্ড। ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের আদেশের বিরুদ্ধে শুকুর আলী হাইকোর্টে জেল আপিল দায়ের করেন। ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির রায় ২০০৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বহাল রাখে হাইকোর্ট। আপিল বিভাগ ২০০৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে দেয়। এই রায় পুনঃবিবেচনা চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন শুকুর আলীর পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত কৌঁসুলি এবিএম বায়েজীদ। ওই বছরের ৪ মে ওই রিভিউ পিটিশনও খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ। ২০০৫ সালে শুকুর আলীর মা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে একটি আবেদন দেন।
ফৌজদারি আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর শুকুর আলীর পাশে দাঁড়ায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। তারা এক দেশে দুই আইনের এই বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে। এ সংক্রান্ত ১৯৯৫ সালে প্রণীত নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৬(২) ধারায় যেখানে শাস্তির বিধান ছিলো কেবল মৃত্যুদণ্ড তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। হাইকোর্ট ২০১০ সালের ২ মার্চ ৬(২) ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। কিন্তু শুকুর আলীর বিচার একটি অবৈধ আইনে সংঘটিত হয়েছিলো ব্লাস্টের এমন আবেদনের উপর কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন ।
উল্লেখ্য, হাইকোর্টের এই রায় দেয়ার আগেই আপিল বিভাগ শুকুর আলীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল রাখে। শুকুর আলীর সাজা একটি অবৈধ আইনে হয়েছে এবং তা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ব্লাস্ট। গত ৫ মে আপিল বিভাগ ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হলে তার শাস্তি কেবল মৃত্যুদণ্ড এই সংক্রান্ত বিধানটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। ঘোষিত এই রায় সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। ওই রায়ে ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইনের ৬ (২)(৪) ধারা, ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩৪(২)(৩) ধারা ও দণ্ডবিধির ৩০৩ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করা হয়। আপিল বিভাগের এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দায়ের করবে ব্লাস্ট।