একাত্তরে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন ওরফে চুটুর আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। বুধবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় দেয়।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম।
তাদের বিরুদ্ধে আনীত তিনটি অভিযোগের মধ্যে দুটি প্রমাণিত হয়েছে। ১ নম্বর অভিযোগে তাদেরকে সর্বসম্মতিক্রমে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ২ নম্বর অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে ৫ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। অন্য অভিযোগটি ড্রপ করা হয়েছে।
১৩৩ পৃষ্ঠার এই রায়ে বলা হয়েছে, দুই আসামির বিরুদ্ধে হত্যা ও গণহত্যার সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম দুটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আর তৃতীয় অভিযোগে এর আগে দালাল আইনে তারা দণ্ডিত হওয়ায় ওই অভিযোগটি বাদ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১নং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। ২নং অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের মতামতের ভিত্তিতে তাদের পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। মাহিদুর ও চুটু মুসলিম লীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে তারা শিবগঞ্জ এলাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধ করে।
তিন নম্বর অভিযোগটি ছিল চারজনকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা এবং বিভিন্ন বাড়ি-ঘরে লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা। এ সম্পর্কে রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, আসামিরা একই অভিযোগে স্বাধীনতার পরেই দালাল আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তারা দণ্ড ভোগ করেছেন। এরপরও ওই আইনের সংশোধিত আইন বা বর্তমান আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ অনুসারে এ অভিযোগটি আনায় সেটা গ্রহণ বরা হয়নি।
একই আইনে একই অভিযোগে কারো দু’বার বিচার হতে পারে না বলে ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করেছে। এর মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) ব্যর্থতা ও অযোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন বলেও রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত সংস্থার পেশকৃত নথিপত্র ও অন্যান্য প্রমাণাদির ভিত্তিতেই প্রসিকিউশন মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যায়।
এ মামলার প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা অভিযোগ প্রমাণে সক্ষম হয়েছি। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর রায় বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আসামিদের বয়স বিবেচনায় এ দন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।"
এর আগে রায় ঘোষণা উপলক্ষে ট্রাইব্যুনাল ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সকাল ৮টার দিকে প্রিজনভ্যানে করে তাদেরকে ট্রাইব্যুনালে এনে হাজতখানায় রাখা হয়। বেলা পৌনে এগারটার দিকে মাহিদুর-চুটুকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানা থেকে এজলাসকক্ষে এনে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয়।
মাহিদুর ও চুটুর পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী আব্দুস সোবহান তরফদার ও মিজানুল ইসলাম।। অপরদিকে ছিলেন প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান ও তুরিন আফরোজ।
গত ২৭ জানুয়ারি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাহিদুর ও আফসারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) জেডএম আলতাফুর রহমানসহ প্রসিকিউশনের মোট ১০ জন সাক্ষী। তবে মাহিদুর ও আফসারের পক্ষে কোনো সাফাই সাক্ষী ছিলো না।
মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে গত বছর ১ ডিসেম্বর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গত ২৪ নভেম্বর আমলে নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুর বিরুদ্ধে গত ১৬ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান এ অভিযোগ দাখিল করেছিলেন। ওইদিন তাদেরকে মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আটক দেখানোর জন্য প্রসিকিউশন আবেদন করেছিল। ২৪ নভেম্বর এ আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল। আসামিরা কারাগারে রয়েছেন।
তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মাহিদুর রহমান ও মো. আফসার হোসেন চুটুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ৬ অক্টোবর সকাল ছয়টা থেকে পরদিন ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত মাহিদুর ও চুটুর সহযোগিতায় রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবপুর থানার চাঁদশিকারী, চামাটোলা, বিনোদপুর উচ্চবিদ্যালয়, চাঁদশিকারী গ্রাম থেকে ২০০ গজ পশ্চিমে ফিরোজের আমবাগান এবং কবিরাজটোলায় যৌথ আক্রমণ চালায়। তারা এসব গ্রামের ৩৯ জনকে আটক করে। কাউকে কাউকে অপহরণ করে। এক পর্যায়ে নির্যাতনের পর ৩৯ জনের মধ্য থেকে ২৪ জনকে হত্যা করে।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর দুপর একটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ আসামিদের সহযোগিতায় রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবপুর থানার এরাদত বিশ্বাসের টোলা এবং কবিরাজটোলা গ্রামে যৌথ আক্রমণ চালায়। এদিন তারা এ দুই গ্রামের ৭০টি বাড়িতে লুণ্ঠনের পর অগ্নিসংযোগ করে।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২ নভেম্বর দুপর ২টা থেকে পরদিন ৩ নভেম্বর রাত পর্যন্ত এ আসামিদের সহযোগিতায় রাজাকার বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার শেরপুর ভান্ডার (লক্ষীপুর), আদিনা ফজলুল হক ডিগ্রি কলেজ, শিবগঞ্জ সিও ডেভ অফিস এবং উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন ইয়াকুব বিশ্বাসের আমবাগান এলাকার চারজনকে অপহরণ করে আটকের পর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। এছাড়াও বিভিন্ন বাড়ি-ঘরে লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
মাহিদুরের বর্তমান বয়স ৮৪ বছর। তার বাড়ি জেলার শিবগঞ্জের দুর্লভপুর ইউনিয়নে দাদনচক গ্রামে। আফসার হোসেনের বয়স ৬৪ বছর। তার বাড়ি বিনোদপুর ইউনিয়নের সাতরশিয়া গ্রামে। গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর তাদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়।
এছাড়াও গত ২০ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজাকার পলাতক সৈয়দ মোঃ হাসান আলী ওরফে হাছেন আলীর বিরুদ্ধে মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে যে কোন দিন রায় ঘোষণার (সিএভি) জন্য রাখা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-১এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ আদেশ দেয়।
