চলতি বছরের পাঁচ মাস শেষ হতে চললেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা বোর্ডের বই হাতে পায়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানুয়ারিতেই বোর্ডের বই পেলেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছাতে প্রতিবছর এপ্রিল মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কিন্তু এবার মে মাসেও বই পায়নি শিক্ষার্থীরা। তারা বলছে, প্রতিবছরই বই পেতে দেরি হয়, এতে তাদের পড়াশুনার ক্ষতি হচ্ছে। অভিভাবকরা বলছেন, প্রতিবছর বলা হয় আগামী বছর সময়মতো বই হাতে পৌঁছাবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয় না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিনামূল্যে সরকারি বই বিতরণ করা হয়। তাই এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা বলছে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্রেইল বই দেয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজ সেবা অধিদফতর।
সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা বলছে, প্রতিষ্ঠানটি শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বই করে। এ বছর ব্রেইল বই করার জন্য টেক্সট বুক বোর্ডকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে সাড়ে এগার হাজার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য বই বিতরণ করা সত্যিকার অর্থে কোন্ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তা যথাযথভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় চিহ্নিত করতে পারেনি। মন্ত্রণালয়গুলোর এই সমন্বয়হীনতার জন্য ভোগান্তি পোহাচ্ছে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। এ প্রসঙ্গে গতবছর সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) জুলফিকার হায়দার ইত্তেফাককে বলেছিলেন, এবছরই সমস্যার সমাধান করে তারা বই সময়মতো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের হাতে দিতে পারবেন। বই দিতে কেন দেরি হচ্ছে চলতি বছর তাকে এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, শিক্ষার যাবতীয় বিষয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তারা ছোট্ট একটি বিশেষ প্রেসে ব্রেইল বই করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় সময়মতো তাদের সফট কপি দেয় না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত তাদের সময়মতো সকল লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া। তিনি আরও বলেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তারা এরই মধ্যে বই দিয়েছেন। বেসরকারি কিংবা এনজিও পরিচালিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের দায়িত্ব নেয়ার মতো সক্ষমতা তাদের নেই। তবে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক খোরশেদ আলম ইত্তেফাককে জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বই আসলেও চাহিদা মোতাবেক বই এসেছে কিনা তিনি সে বিষয়ে নিশ্চিত নন।
শিক্ষাসচিব দেশের বাইরে থাকায় তার দায়িত্ব পালনরত অতিরিক্ত সচিব (এডমিন) ড. অরুণা বিশ্বাস ইত্তেফাককে বলেন, যতদূর জানি এরই মধ্যে ব্রেইল বই দেয়া হয়েছে। তবে কেন ওইসব স্কুল তা পায়নি, তিনি তা খোঁজ করে দেখবেন। এই বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (মাধ্যমিক শিক্ষা) জাকির হোসেন ভূইয়ার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন ড. অরুণা বিশ্বাস। যোগাযোগ করা হলে জাকির হোসেন বলেন, বিষয়টি সমাজসেবা অধিদপ্তর দেখছে।
সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব তারিক-উল-ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, এবছর ন্যাশনাল টেক্সট বুক বোর্ডকে (এনটিবিবি) ব্রেইল বই করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তাই বই পেতে একটু দেরি হচ্ছে। আর ন্যাশনাল টেক্সট বুক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র পাল বলেন, এবছর তাদের যে ব্রেইল করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সে বিষয়টি তার জানা নেই। তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নূরুল কবীর ইত্তেফাককে বলেন, ব্রেইল করার জন্য তাদের জনবল ও মেশিনারিজ কম বলে বই দিতে দেরি হচ্ছে। তারা তিনটি বিশ্বমানের ব্রেইল প্রিন্টার আনার পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা আনলে এই সমস্যা দূর হবে।
ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী কামরুন নাহার জানান, প্রতিবছরই বছরের বেশ কিছুদিন তাদের পুরোনো বই ভাগাভাগি করে পড়া চালিয়ে যেতে হয়। একই শ্রেণীর সূচনা আক্তার জানান, দেরিতে হলেও বোর্ডের কিছু বই তাদের হাতে আসে; কিন্তু ইংরেজি গ্রামার বা বাংলা ব্যাকরণ বই তারা পায় না। মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট স্কুল শাখার প্রধান জিনাত ফারহানা বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে স্থায়ী সমাধানে আসা।
ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলের অধ্যক্ষ মমতা বৈরাগী বলেন, বইয়ের জন্য তারা বারবার সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করেও কোন সদুত্তর পাননি। তিনি বলেন, কিছু এনজিও ব্রেইল বই করে। আমরা তাদের কাছ থেকে একসেট বই এনে নিজস্ব প্রেসে প্রিন্ট করে কাজ চালিয়ে নেই। ব্রেইল বইয়ের ব্যয়ভার অনেক বেশি। কারণ ভারি কাগজে তা করতে হয়। একসেট বই করতে ১৭ হাজার টাকা খরচ হয়।