অপুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতার অভাবে দেশের ৪০ ভাগ শিশু খর্বাকৃতি

আপডেট : ২১ মে ২০১৫, ০১:৫০

মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ বস্তিতে ময়লার স্তূপের পাশেই বসে আম মাখা ভাত খাচ্ছিল পাঁচ বছরের সুমাইয়া। তার খাবারের উপর ভন ভন করে মাছি বসছে, এরই মধ্যে খাচ্ছিল শিশুটি। পাঁচ বছরের এই শিশুটিকে দেখাচ্ছে ঠিক যেন আড়াই তিন বছরের শিশুর মতো। এ ব্যাপারে সুমাইয়ার দাদী সুফিয়া খাতুন বলেন, ‘বাইচ্চা খায় ভালই কিন্তু বাড়তি কম; কারণ বাইচ্চার বাপে-মায়ে খাটো, হের ল্যাইগা বাইচ্চাও খাটো’। কিন্তু মাথা মোটা আর বড় বড় চোখ দুটো দেখে সহজেই বোঝা যায়, শিশুটি অপুষ্টিতে ভুগছে।

 
অপুষ্টি আর পরিচ্ছন্নতার অভাবে বর্তমানে দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুর মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগ শিশু খর্বাকৃতি হয়ে থাকে। তবে শিশুর খর্বাকৃতি রোধে শুধু পুষ্টির অভাব দূর করলেই হবে না; পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে জানান সংশ্লি­­ষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
 
বর্তমানে খাদ্যশস্যে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মানবদেহে যে বিষ প্রবেশ করছে, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বরূপ শরীরে ঠিকমত পুষ্টিগুণ কাজ করছে না। ফলে পুষ্টিকর খাবার খেলেও আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এটি শিশু খর্বাকৃতি হওয়ার একটি কারণ। গ্রামে ও শহরের বস্তিতে এই প্রবণতা বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা-বাবার খর্বাকৃতির কারণে শতকরা ১০ ভাগ শিশু খর্বাকৃতি হতে পারে। তবে পুষ্টিকর খাবারসহ হাত ধোয়ার অভ্যাস, পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মা জানেন না শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাবার কোনটি। তাছাড়া, জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে শালদুধ পান করানো জরুরি এবং জন্মের পর ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 
এছাড়া অপরিচ্ছন্নতার কারণে শিশুর ডায়রিয়া হলে শিশু পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এ ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। শিশুর পাশাপাশি মায়েরও সঠিক পরিচর্যা করতে হবে। তবে এই সমস্যা সমাধানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে বলে জানান সংশ্লি­ষ্ট বিশেষজ্ঞরা। 
 
এদেশের অনেক শিশু বয়স অনুযায়ী বাড়ে না। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ২০১২ সালে খর্বাকৃতি শিশু বিষয়ে কাজ শুরু করে ‘ম্যাক্স’। এই সমস্যা থেকে বের হতে চাইলে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে উল্লে­খ করে ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের পরামর্শক মার্ক এলারি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পাঁচ বছরের কম শিশুদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ শিশুরই বয়সের তুলনায় ও ১৬ শতাংশ শিশু উচ্চতার তুলনায় কম ওজন রয়েছে। যাদের গড়ে ২১ শতাংশই খর্বকায়। এটা ভয়াবহ সমস্যা। এর একটি কারণ পুষ্টিহীনতা। আক্রান্ত শিশুর ৩৩ ভাগ পুষ্টিহীনতার কারণে কম বাড়ে। ডায়রিয়ার কারণে প্রায় আড়াই শতাংশ শিশু এ সমস্যার শিকার হয়। বাকি ৬৫ শতাংশ শিশু কী কারণে আকারে ছোট হয়ে থাকে তা সঠিক জানা যায়নি।
 
মার্ক বলেন, পাকস্থলি সংক্রমণের সমস্যা ২ বছরের শিশুর মধ্যে বেশি। এর প্রধান কারণ উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ। তবে তৃণমূলের থেকে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারলে এ সমস্যা অনেকটাই মোকাবেলা করা সম্ভব। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে শিশু খর্বাকৃতি হবার অন্যতম কারণ তাদের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব। শিশুদের তদারকি করা ও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাবা-মায়েরাই অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারেন।
 
শিশু খর্বাকৃতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনটি প্রতিবন্ধকতা উল্লে­খ করে গবেষক উম্মে ফারাহ ডেইজি বলেন, প্রথমত, খর্বাকৃতির মানুষ সম্পর্কে সকলের ধারণা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা অথবা বাবা-মা খাটো তাই সন্তানও খাটো হয়। মানুষের এই ভুল ধারণা ভেঙে দেয়াটাও একটা চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ হাত ধোয়ার উপকারিতা সম্পর্কে জানলেও এর প্রয়োগটা খুবই কম। তৃতীয়ত, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুষ্টির প্রয়োজনীয়তার কথা জানলেও সেই জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টি নিশ্চিত করাও একটা চ্যালেঞ্জ। যা সঠিক উচ্চতার শিশুর জন্য অন্তরায়।
 
ইউএসটির নির্বাহী পরিচালক শাহ মো. আনোয়ার বলেন, স্যানিটেশন ও অপুষ্টি শিশু খর্বকায়ের জন্য দায়ী হলেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গর্ভকালীন মায়ের সঠিক যত্ন। মা নিজেই যদি অপুষ্টিতে ভোগেন তাহলে তার কাছে একটা ভালো সন্তান আশা করা যায় না। শিশু জন্ম নেয়ার পরও যদি অবহেলার কারণে পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন রোগে শিশু আক্রান্ত হয় তাহলেও শিশু খর্বাকৃতির হতে পারে। এখানে দারিদ্র্যতা একটা বড় কারণ।
 
পুষ্টিবিদ আফরোজা বলেন, শিশুদের ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ পান করানো এখনো শতভাগ নিশ্চিত করা যায়নি। বর্তমানে এই হার মাত্র ৬৪ শতাংশ। এ ছাড়া শিশুকে কি খাওয়াবে, কিভাবে খাওয়াবে এ সম্পর্কে মাকে সঠিক জ্ঞান দেয়াও একটা চ্যালেঞ্জ।
 

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুভাস চন্দ্র সরকার বলেন, আমরা ডায়রিয়া, কলেরা বন্ধ নিশ্চিত করতে শতভাগ স্যানিটেশনের জন্য কাজ করেছি। কিন্তু শিশু খর্বকায়ের জন্যও এটা দায়ী সেটা আমাদের জন্য একটা নতুন ধারণা। এই খর্বাকার শিশুদের হার কমাতে সকলে মিলে কাজ করে যাওয়া এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে বলে জানান।