থাইল্যান্ডের সঙ্খলা প্রদেশের সীমান্তবর্তী পাটাংবাচা জঙ্গলে সন্ধান পাওয়া গণকবরের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বাংলাদেশি টোটন সাহা (২৮)। বর্তমানে তাকে থাই সরকারের সংরক্ষিত এলাকায় রাখা হয়েছে। গত ১ মে পাটাংবাচা জঙ্গলে নারায়ণগঞ্জের টোটন সাহাকে ঘুরতে দেখেন থাই রাবার শ্রমিকরা। পরে তাকে উদ্ধার করে মোটরসাইকেলে করে পাহাড়ি জঙ্গল থেকে সমতল ভূমিতে নিয়ে আসেন। গণকবরের সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে কবর দেয়া হয় এবং মানব পাচারকারীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে এই টোটন শাহার কাছে। দীর্ঘ ৯ মাসের মধ্যে সাত মাস তিনি ছিলেন মানব পাচারকারীদের ক্যাম্পে বন্দী আর সর্বশেষ পুলিশ হেফাজতের আগের দুই মাস জঙ্গলে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তিনি। টোটন সাহা তার সঙ্গে একই নৌকায় আসা অসংখ্য রোহিঙ্গার উপর চালানো নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতন প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক থাই রাবার শ্রমিক ইত্তেফাককে জানান, সঙ্খলার জঙ্গলে চোখের সামনে একের পর এক গণকবর দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন রাবার শ্রমিকরা। প্রতিদিন মোটর সাইকেল নিয়ে রাত ১২টার পর থেকে ভোর রাত পর্যন্ত জঙ্গলে কাজ করেন শ্রমিকরা। এসব দেখে তারা বৌদ্ধ মালিকদের অবগত করেন। পরে মালিক-শ্রমিক মুসলিম কমিটিকে জানালে তারা গণকবরের বিষয়টি থাই সরকারকে অবগত করেন। এরপর শুরু হয় গণকবরে উদ্ধার অভিযান।
নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মানব পাচারকারীদের ক্যাম্প থেকে পালিয়ে ছিলেন টোটন সাহা। ওইদিন ভোরে গহীন জঙ্গলে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ঘুরতে দেখা যায় টোটন সাহাকে। পরে তাকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে রাবার শ্রমিকরা স্থানীয় পাটাংবাচা হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তির মাত্র তিন ঘন্টার ব্যবধানে টোটন সাহাকে থাই পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। স্থানীয় একাধিক রাবার শ্রমিক জানিয়েছেন, এই টোটন সাহা দীর্ঘ ৯ মাস পাটাংবাচা জঙ্গলে ছিলেন। এ পর্যন্ত শুধু রাবার শ্রমিক ও থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা টোটন সাহার সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন। এছাড়া তিনি দেশে অবস্থান করা তার মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন।
জানা গেছে, প্রায় ৯ মাস আগে কক্সবাজার থেকে ছোট নৌকায় চড়ে থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হন টোটন। চারঘন্টা ছোট নৌকায় চলার একপর্যায়ে সাগরের মাঝপথে মিয়ানমারের নৌ-বাহিনীর সহায়তায় বড় একটি নৌকায় তোলা হয় তাকে। বড় নৌকায় তোলার পর শুরু হয় টোটনসহ অন্যদের উপর নির্যাতন। সেখান থেকে ১০ দিন পর তাকে সঙ্খলা জঙ্গলে আনা হয়। মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী এই জঙ্গলে টোটন সাহাকে আনার পর তার মা কানন সাহাকে মালয়েশিয়ার সিম ব্যবহার করে ফোন দেন মানব পাচারকারীরা। ফোনে তারা টোটনের মাকে বলেন, ‘ছেলে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে গেছে, এবার টাকা পাঠান’। টোটনের মায়ের কাছে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা দাবি করে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। দরিদ্র হিন্দু সম্প্রদায়ের টোটন সাহার মা কোনমতে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে মানব পাচারকারী মাফিয়াদের হুন্ডি করে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু এতেও মন গলেনি পাচারকারীদের। টাকা পাওয়ার পর চলে অমানসিক নির্যাতন। তাকে নিয়মিত খেতে দেয়া হতো না। পুরো টাকা পাঠানো সম্ভব হয়নি বলে তাকে দীর্ঘ সাত মাস মানব পাচার চক্র জঙ্গলে ওদের ক্যাম্পে বন্দী করে রাখে। একপর্যায়ে মাফিয়াদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন টোটন। জঙ্গলে এখানে-ওখানে ঘুরে প্রায় দুই মাস পার করেন তিনি। জঙ্গলের বিভিন্ন ধরনের পাতা-ফল খেয়ে বেঁচেছিলেন তিনি। গত ১ মে স্থানীয় রাবার শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে। এরপর ২ মে আরো ১৪ জন বাংলাদেশিকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে তারা ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে আছে। তারা স্থানীয়দের জানিয়েছেন, ‘রাষ্ট্রবিহীন’ রোহিঙ্গারা মানব পাচারকারীদের মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। আর যারা টাকা দিতে পারেন তাদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো হতো। কিন্তু এভাবে কষ্ট সহ্য করতে হবে জানলে কখনো অবৈধ পথে বিদেশ আসতাম না। তারা কাউকে এভাবে বিদেশ পাড়ি না দিতে আহবান জানান।
টোটন সাহা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তাদের চাহিদা অনুযায়ী সব টাকা দিতে না পারায় বিভিন্ন সময় অত্যাচার চালাতো তারা। টোটনকে জাহাজে থ্রি স্টার, ফোর স্টার ও ফাইভ স্টার সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিদেশ পাঠানো হবে বলে প্রলোভন দেখানো হয়। এই লোভে পড়ে সে মানব পাচারকারীদের কবলে পড়ে। টোটন সাহার সঙ্গে আরো আরাকান রোহিঙ্গা ছিল।
থাই সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টোটন সাহার কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছে পুলিশ। তার তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন অভিযান চালাচ্ছে যৌথবাহিনী। ইতিমধ্যে মানব পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে ফেলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে থাই সরকার। এই জন্য তাদের সংরক্ষিত হেফাজতে রাখা হয়েছে তাকে। টোটন বাংলাদেশি সেটি ব্যাংককস্থ বাংলাদেশি দূতাবাস নিশ্চিত করেছে। শিগগিরই তাকে দেশে পাঠানো হবে।
