টানা চারদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলে পরিবহন ধর্মঘট চলার ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে হাজার হাজার যাত্রী। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধর্মঘট নিরসনে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার ঘোষণা দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার রাতে সোহাগ পরিবহনের বাসে ডাকাতির ঘটনায় মধুখালী পুলিশ চালক ও হেলপারসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। তাদের মুক্তির দাবিতে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার জামিল হাসান ও মধুখালী থানার ওসি রহুল আমিনকে প্রত্যাহারের দাবিতে বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন।
গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে ঢাকার পথে কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। এসব জেলার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটেও যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। যানবাহন বন্ধ থাকায় বেনাপোলে ভারত ফেরত অনেক যাত্রী এবং এসব জেলায় ঘুরতে যাওয়া অনেকেই তিনদিন ধরে আটকা পড়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
ধর্মঘটের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য তিনি নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের সঙ্গে কথা বলবেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, গতকাল পর্যন্ত প্রশাসন থেকে কোন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তিনি বলেন, ঘটনার জন্য দায়ী ফরিদপুরের পুলিশ সুপার ও স্থানীয় প্রশাসন। তাদের গাফিলতির কারণেই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, সোহাগ পরিবহনের পক্ষ থেকে ডাকাতদের ছবি ও পাসপোর্টের ফটোকপি পুলিশের কাছে দেয়া হয়েছে। তারপরও পুলিশ ডাকাতদের গ্রেফতারের ব্যাপারে পদক্ষেপ না নিয়ে বাস চালক হেলপারকে গ্রেফতার করেছে। তারা নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে। বার বার বাস ডাকাতির ঘটনা ঘটছে মধুখালী এলাকায়। কিন্তু কোন ডাকাতকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি।
বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক সমিতি যশোরের সভাপতি আজিজুল আলম মিন্টু বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। আমরা আমাদের দাবি আদায়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোন অবস্থায় ধর্মঘট প্রত্যাহার করব না।’
জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হাবিবুর রহমান হবু বলেন, ‘গ্রেফতারকৃত পরিবহন শ্রমিকদের মুক্তিসহ আগামীকালের মধ্যে দাবি না মানলে জেলা থেকে ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হবে।’
ঢাকার একজন পরিবহন নেতা বলেন, গতকাল খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি তাকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু এটা খুলনা রেঞ্জের ডিআইজির চেয়ে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজির দায়িত্ব বেশি। কিন্তু ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এ পর্যন্ত কোন পরিবহন নেতার সঙ্গে আলোচনা পর্যন্ত করেননি।
বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, বেনাপোল থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার অন্তত ১০টি পথে বাস চলাচল করে। অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটে ভারত ফেরত এসব রুটের কয়েকশ’ যাত্রী বেনাপোল থেকে গন্তব্যে যেতে পারছে না। গতকাল বেনাপোলের ঈগল পরিবহনের বিশ্রামাগারে ভারত ফেরত তরুণ কুমার বিশ্বাস, শেখ আবু জামাল, সাইদুজ্জামান ও তার স্ত্রী রাফিজ্জামান এবং হরিশচন্দ্র পাল অপেক্ষা করছিলেন। তারা জানান, ঢাকাগামী যানবাহন না ছাড়ায় পরিবার নিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন।
সকালে ভারত থেকে দেশে ফিরে স্ত্রী-সন্তানসহ ঢাকার বকশীবাজার এলাকার নকুল সাহা এবং মাদারীপুরের নাজির আহম্মেদ ও সাখাওয়াত হোসেন একই কারণে বাড়ি ফিরতে পারছেন না। তারা অবস্থান নিয়েছেন বেনাপোলে চেকপোস্টের খাজাবাবা সুপার মার্কেটের একটি মানিচেঞ্জার কাউন্টারে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরা থেকে ঢাকাগামী সকল পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরিবহন বন্ধ থাকায় ঢাকা যেতে ইচ্ছুক যাত্রীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। সাতক্ষীরা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবু আহমেদ জানান, আটক শ্রমিকদের মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত মালিক ও শ্রমিকরা তাদের পরিবহন ধর্মঘট চালিয়ে যাবে ।
নড়াইল প্রতিনিধি জানান, যাত্রীরা নিরুপায় হয়ে ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল, ইজিবাইক ও নছিমন-করিমনে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, বাস ধর্মঘটের ফলে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সাথে সড়ক পথে কুষ্টিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। কুষ্টিয়া বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক এসএম রেজাউল ইসলাম বাবলু জানান, দাবি আদায় না মানা পর্যন্ত বাস ধর্মঘট চলবে বলে তিনি জানান।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, দূরপাল্লা ও স্থানীয় রুটের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। ধর্মঘটের কারণে বাস চলাচল না করায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।
ঝিনাইদহ বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি উজ্জল বিশ্বাস জানান, জেলার সকল রুটের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।
