রোহিঙ্গা আনোয়ারের নেতৃত্বে হত্যাযজ্ঞ

আপডেট : ২৩ মে ২০১৫, ১৯:৫৩
মানুষ যে এতো নিষ্ঠুর-নির্মম হতে পারে তা ভাবনায় ছিল না মানবপাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের। সরল বিশ্বাসে ভাগ্যের উন্নয়নের আশায় সমুদ্রে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় কাপর্ণ্যবোধ করেননি নির্যাতিত মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা এবং কিছু বাংলাদেশি। কিন্তু নিজ সম্প্রদায়ের যাকে বিশ্বাস করে সমুদ্র যাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন, তিনি যে এতো ভয়ংকর তা জানা ছিল না তাদের। শুধু কিছু টাকার জন্যে সাগরের মাঝ পথ থেকে শুরু করে থাই জঙ্গলে একের পর এক মানুষ হত্যা করেছেন তিনি ও তার সহযোগীরা। হত্যাযজ্ঞ সব সিনেমা বা কল্প-কাহিনীকেও হার মানিয়েছেন তিনি। 
 
এই হত্যাযজ্ঞের মূল নায়ক হলেন মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মুন্ডের বাসিন্দা হাজী নানুর পুত্র মো. আনোয়ার। 
 
এ পর্যন্ত প্রায় তিনশতাধিক মানবপাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিকে সমুদ্র ও থাই জঙ্গলে এই আনোয়ার ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা হত্যা করেছে। তবে শুধু হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি, নারীদের বন্দী রেখে অমানসিক পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছেন দিনের পর দিন। গত ১লা মে সংখলা জঙ্গলে গণকবরের সন্ধানের পরপরই মালয়েশিয়া সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেফতার করে থাই পুলিশ। ইতিমধ্যে জঙ্গলে গণকবরে তার সম্পৃক্ততার বিষয় থাই পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন আনোয়ার। গণকবরে যাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তাদেরকে আনোয়ার ও তার সহযোগীরা জঙ্গলে এনেছিলেন বলে দাবি রোহিঙ্গাদের। 
 
থাই পুলিশের চলমান অভিযানে আনোয়ারের সহযোগীর হেফাজত থেকে এক কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
 
হত্যার মূল হোতা আনোয়ার
মানবপাচারের শিকার রোহিঙ্গারা জানান, সংখলা ও সাগর পথে অসংখ্যা মানুষকে হত্যা করেছে রোহিঙ্গা আনোয়ার ও তার সহযোগীরা। এই আনোয়ারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল মানবপাচারের সাম্রাজ্য। গত ১লা মে’র আগে মিয়ানমারের আরাকানের মন্ডুর (বর্তমানে সাউথ থাইল্যান্ডের বাসিন্দা) খইলা মিয়ার (রোহিঙ্গা) দুই ভাতিজাকে টাকার জন্য জঙ্গলে মেরে ফেলে আনোয়ার ও তার সহযোগিরা। বিষয়টি জানতে পেরে খইলা আনোয়ারকে ফোন করে উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় করে। তখন আনোয়ার ফোনে তাকে বলে, টাকার প্রয়োজনে তোকেও হত্যা করব। এ রকম অসংখ্য ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। পরে আনোয়ারকে গ্রেফতার করা হলে খইলা বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর বেরিয়ে আসে জঙ্গলে আনোয়ারের মানুষ হত্যার একের পর এক ঘটনা।
 
আনোয়ারের মানবপাচার সিন্ডিকেট
২০১২ সাল থেকে আনোয়ার সাগরপথে মানবপাচার কার্যক্রম শুরু করে। মিয়ানমার প্রশাসন স্থানীয় রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করলে ২০১৩ সালে ব্যাপক হারে দেশত্যাগে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা। এতে মানবপাচারের পোয়াবারো হয় আনোয়ারের। স্থানীয় আরাকানের মুন্ডে তার ছোট ভাই মাওলানা নাফিজ বিনা পয়সায় রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে মালয়েশিয়ায় যেতে উৎসাহ দেন। মালয়েশিয়ায় পৌঁছে কাজ করে টাকা দিতে হবে বলে রোহিঙ্গাদের আশ্বস্ত করা হয়। নাফিজের দায়িত্ব ছিল রোহিঙ্গা সংগ্রহ করে ছোট নৌকা ভরে মিয়ানমার নৌবাহিনীর সহায়তায় বঙ্গোবসাগরের জিনজিয়ায় নিয়ে যাওয়া। নাফিজের নেতৃত্বে আরাকানে রয়েছে একটি শক্তিশালী মানবপাচার গং। যারা অনেক সময় জোর পূর্বক সপরিবারে রোহিঙ্গাদের নৌকায় তুলে দিতো। পরে ছোট বোর্ড থেকে তাদের নামিয়ে আগেই অবস্থান করা থাই বড় বোর্ডে করে মানবপাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের থাইল্যান্ড জঙ্গলে আনা হতো। জিনজিরা থেকে থাই জঙ্গল এই পুরো অংশে আনোয়ার নিজে ও তার সহযোগী রশিদ, ইসমাইল, আলী, নুরুল হাকিম, হোসেন, মং সিং, সামার পোয়া প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করতো। আনোয়ারের আরেক ভাই মোস্তফা মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী অংশ দেখভাল করতেন।