কবি যথার্থই বলেছেন, “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি!”
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি আমাদের এই দেশ, বাংলাদেশ। তার অপরূপ সৌন্দর্য্য দেশ-বিদেশের সৌন্দর্যপ্রিয়-প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে আকর্ষণ করে। পর্যটক হিসেবে প্রচুর মানুষ তাই বাংলাদেশের নানা প্রান্তে ঘুরতে চান। এই দেশে পরিচিত অপরিচিত অনেক পর্যটক-আকর্ষক স্থান আছে। এর মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক মসজিদ এবং মিনার, পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, অরণ্য ইত্যাদি অন্যতম। আর বাংলাদেশের এই অপরূপ রূপ দেখতে আসা ভ্রমণকারীদের জন্য একটি সঠিক গাইডলাইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভুত হয়ে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে।
অবশেষে তা সম্পন্ন হয়েছে, সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন এবং বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের কোন কোন জায়গায় পর্যটনের কি ধরনের সুবিধা রয়েছে সে সম্পর্কিত তথ্য যুক্ত হয়েছে জাতীয় তথ্য বাতায়নে।
জাতীয় তথ্য বাতায়ন কী?
প্রসঙ্গত জাতীয় তথ্য বাতায়নের কথা শুরুতে একটু বলতে হয়- এক কথায় বললে, এটি একটি দরজা, যেখানে প্রবেশ করলে পাওয়া যাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য।
এই একটিমাত্র ঠিকানা থেকে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়সহ দেশের সকল সরকারি দপ্তরের সকল তথ্য পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্র, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সচিত্র বিবরণ। এই বাতায়নে সম্পৃক্ত রয়েছে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক সরকারি ওয়েবসাইট। যার সংখ্যা ২৫,০০০-এরও অধিক। এতে যুক্ত করা হয়েছে ও ৪২,০০০ সরকারি দপ্তরকে। সে হিসেবে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সরকারি ওয়েবপোর্টাল।
জাতীয় তথ্য বাতায়ন থেকে নাগরিকগণ খুব সহজেই পাবেন কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, আইন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্য, শিক্ষা প্রতিষ্টানসমূহ ছাড়াও সরকারি সার্কুলার/গেজেট, প্রদেয় সেবাসমূহ ও তা পাবার ধাপসমূহ, সরকারি ফর্মসমূহ, সিটিজেন চার্টার, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দের তালিকা, ডিজিটাল গার্ড ফাইল, ই-ডিরেক্টরি, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা, বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধি এবং জাতীয় ই-সেবাসমূহসহ বিভিন্ন প্রকল্পসমূহের দরকারি তথ্য। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের সকল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের তালিকাও এতে সন্নিবেশ করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, এটুআই প্রোগ্রাম, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ, অধিদপ্তর, মাঠ পর্যায়ের বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের অফিসসমূহ, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), বাংলাদেশ এসোসিয়েসন অব সফট্ওয়্যার এণ্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) জাতীয় তথ্য বাতায়ন তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
জনগণের তথ্য ও সেবা প্রাপ্তি আরও সহজ করার লক্ষ্যে জাতীয় তথ্য বাতায়নে অর্ন্তভূক্ত বিভিন্ন বিষয় যেমন- কর্তকর্তা-কর্মচারীদের ই-ডিরেক্টরি, প্রতিষ্ঠানসমূহের ডিরেক্টরি, ই-সার্ভিস ডিরেক্টরি, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি ফরমসমূহ, টেলিফোন ডিরেক্টরি, হোটেল, মোটেল, রেস্তোরা ও ব্যাংক ডিরেক্টরি, পর্যটন এবং প্রয়োজনীয় বিধি ও সার্ক্যুলার ইত্যাদি নিয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মোবাইল এ্যাপস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় তথ্য বাতায়নকে প্রতিবন্ধীদের ব্যবহার উপযোগী করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় তথ্য বাতায়ন ও পর্যটন কর্পোরেশন:
বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ। বিশেষ করে পর্যটন শিল্পকে ধরলে এ কথাটা যে শতভাগ খাটি তা বলাবাহুল্য। একটি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ বিদেশি পর্যটক আসেন। বলাবাহুল্য এসব পর্যটকদের কারণে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হয় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোতে ভ্রমণের জন্য যান। একটি হিসাব অনুযায়ী পর্যটনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকা টার্নওভার হয়ে থাকে।
বলাবাহুল্য, এ খাতটিকে যদি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য স্বাচ্ছন্দময় করে তোলা যায় তবে দেশি এবং বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই জাতীয় তথ্য বাতায়ন ও পর্যটন কর্পোরেশন বাংলাদেশে পর্যটনের সকল তথ্য পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করেছে যৌথভাবে।
জাতীয় তথ্য বাতায়নের গেটওয়ে ব্যবহার করে বাংলাদেশের পর্যটন কর্পোরেশনের সাইটে ঢুকতে হলে ওপরে ডানদিকের সার্চবক্সে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন অথবা বামদিকের প্রথম তালিকা “বাংলাদেশ সম্পর্কিত” ট্যাব খুলে নিয়ে “পর্যটন” অপশনটিতে ক্লিক করতে হবে। ব্যাস, তাতেই চলে আসবে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের পেজ। সেখানে পাওয়া যাবে বাংলাদেশে ভ্রমণ সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য।
পেজটিতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন সম্পর্কিত তথ্য ছাড়াও আকর্ষণীয় স্থানসমূহ, হোটেল, মোটেলের তথ্য, ফটোগ্যালারি, এয়ারলাইন্সসমূহের তালিকা, রেন্ট-এ-কার সার্ভিসসমূহের তালিকা, ট্যুর অপারেটরদের তালিকা, ট্রাভেল এজেন্সীসমূহের তালিকা, ভ্রমণ সহায়ক তথ্যাবলী, আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য, মুদ্রা পরিবর্তন, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য, নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের লিংক রয়েছে। যেখান থেকে মাত্র এক ক্লিকে সকল তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। পর্যটন নগরী কক্সবাজার, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা, সিলেট, কুয়াকাটা, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, খুলনা, মেহেরপুর, গোপালগঞ্জ ইত্যাদি এলাকায় পর্যটন আকর্ষণীয় স্থানসমূহে হোটেল, মোটেল, পিকনিক স্পট, রেস্তোরাঁ, বার, সুইমিং পুল, গল্ফ-কোর্স ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি যে কেউ জাতীয় তথ্য বাতায়নে প্রবেশের মধ্য দিয়ে সহজে লাভ করতে পারেন।
উল্লেখ্য, জাতীয় তথ্য বাতায়নকে সমৃদ্ধ করার কাজ করে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অবস্থিত একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) টিম। ইতিমধ্যে এ এটুআই তাদের কর্মতৎপরতার আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে। ২০১৪ সালে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা প্রদানের জন্য স্থাপিত “ডিজিটাল সেন্টার” বিশ্বের আইসিটি সেক্টরের সম্মানজনক ‘ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (ডাব্লিউএসআইএস)’WSIS পুরস্কার অর্জন করেছিল। এটুআই প্রকল্পের দুটি উদ্যোগ “একসেস টু ইনফরমেশন এন্ড নলেজ” ক্যাটাগরিতে জাতীয় তথ্য বাতায়ন ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ক্যাটাগরিতে “শিক্ষক বাতায়ন” মনোনীত হয়েছে।
ইতিমধ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সোমবার থেকে শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী ডাব্লিউএসআইএস ফোরামে যোগ দিয়েছেন এটুআইয়ের প্রতিনিধি দল। দলে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক ও মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার, এটুআই প্রোগ্রামের পলিসি অ্যাডভাইজার আনীর চৌধুরী এবং ই-সার্ভিস পরিচালক ড. মোঃ আব্দুল মান্নান। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪টায় সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা ও পুরস্কার দেয়া হবে।
উল্লেখ্য, WSIS পুরস্কারটি বিশ্বে তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের বড় ধরনের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল উদ্ভাবনগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটির এ পুরস্কার বাংলাদেশকে যেমন অনুপ্রাণিত করবে তেমন এদেশের বিভিন্ন উদ্যোগ, উদ্ভাবন এবং উন্নয়ন কৌশল অন্যদেশে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে। এটুআইয়ের জন্য নি:সন্দেহে এটি একটি বড় স্বীকৃতি।
দেশের সব শ্রেণীর মানুষের কাছে সরকারি যাবতীয় তথ্য সহজে পৌছে দেয়ার লক্ষ্যে এটুআই কাজ করছে নিরলসভাবে। যার একটি সফল উদাহরণ জাতীয় তথ্য বাতায়ন।
এখানে একনজরে জাতীয় তথ্য বাতায়নের সেবা ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হলো:
- ৪২,৫৭২টি সরকারি অফিসের তথ্য
- ২০,৩৯,১০৭ কন্টেন্টস;
- ৩০,০০০+ জন তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার তথ্য;
- ৪৫,৩৮৬টি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পুরাকীর্তি, ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যের ছবি
- ৭,০০,০০০+ জনের ই-ডিরেক্টরি
- ৭০,০০০+ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পৃক্ত
- ৫৭,১৩৪টি প্রকল্প
- ৫৩,৮২৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
- ২৫,৮৩০জন জনপ্রতিনিধি
- ১৯,০০৬টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
- ১০,৬০৩টি হাটবাজার
- ৫,৮০৮টি দর্শনীয় স্থান
- ১,৬৯৮টি হোটেল ও আবাসন
- ১,৩৩৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান
- ১,৩৩৪টি ডিজিটাল গার্ড ফাইল
- ১,০১৮টি সংবাদপত্র
- ১১০২টি হাসপাতাল/ক্লিনিক
- ১৫০জন মাস্টার ট্রেইনার
- প্রতি জেলা ও উপজেলায় একাধিক প্রশিক্ষক
- ১০০০+ ইনোভেশন টিম এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা আইসিটি কমিটি সম্পৃক্ত রয়েছে
- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জেলা ও উপজেলা সমন্বয় সভায় জাতীয় বাতায়নকে এজেণ্ডাভুক্ত করা হয়েছে
- জাতীয় বাতায়নের সমস্যা সমাধানে এনপিএফ ফেসবুক এবং গ্রুপ ই-মেইলের ব্যবহার করা হয়
- বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পোর্টাল তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল রয়েছে
- মন্ত্রণালয়/বিভাগের পোর্টাল তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল রয়েছে
- মন্ত্রণালয়/বিভাগ, অধিদপ্তর, বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পোর্টাল তৈরির জন্য কন্টেন্ট গাইডলাইন রয়েছে
- অধিদপ্তরের পোর্টাল তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল রয়েছে
- মন্ত্রণালয়/বিভাগ, অধিদপ্তর, বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পোর্টালের জন্য খসড়া গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে।
