একটি অদ্ভুত বিষণ্ন আর মর্মান্তিক সময় পার করছি আমরা। কলেজে লজিক পড়ার সময় জেনেছিলাম মানুষ অন্য প্রাণীর চেয়ে আলাদা কারণ তার মধ্যে এনিমিলিটির সাথে রেশনালিটি যুক্ত থাকে। যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে পারে বলে সে অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে অনেক উন্নত। সময়ের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এখন আর নিজেদের এত বড় করে ভাবতে পারি না। এখন দেখছি মানুষই মানুষের কষ্টের কারণ। ছেলেবেলায় একজন মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখতাম। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন আর আবোল-তাবোল কথা বলতে থাকতেন। ক্ষুধা লাগলে অনেক সময় আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার মা যত্ন করে তাকে ভাত খেতে দিতেন। বুঝতাম খালেক পাগল মায়ের বেশ অনুগত। এই খালেক পাগল মাঝে মাঝে দার্শনিকের মত একটি কথা বলতেন। গলা চড়িয়ে বলতেন, ‘কে কয়রে (বলে) আল্লায় মানুষ মারে, মানুষ মানুষরে মারে’। কালক্রমে দেখলাম আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা বাদ দিলে মানুষের মধ্যেই (অবশ্যই সকল মানুষ নয়) হিংস্রতা বেশি। মানুষের হাতেই মানুষ বিপদগ্রস্ত হচ্ছে বেশি।
এখন এমন এক অবস্থা এদেশের সাধারণ মানুষের যে তাদের স্বাভাবিক জীবন প্রতি মুহূর্তে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নানাভাবে ক্ষমতাধরদের হাতে জিম্মি হয়ে যাচ্ছি আমরা। সকল পক্ষ নিজেদের লাভের আর লোভের ফসল ঘরে তুলতে জিম্মি করছে সাধারণ মানুষকে। আর এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেয়ারও যেন কেউ নেই। মানুষকে জিম্মি করার খড়গ হাতে নিয়ে আছেন মানবপাচারকারী, বাস ট্রাকের শ্রমিক আর মালিক, হাসপাতালের চিকিত্সক, রাজনীতিক, শিক্ষক সকলে। আর এর পক্ষে উদাহরণতো হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়।
গত ২২ মে ঢাকায় একটি বৈঠক হচ্ছিল বিএনপির সিনিয়র নেতাদের উপস্থিতিতে। বিষয় ছিল দলটির নেতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনের করণীয় নির্ধারণ। সিদ্ধান্ত জানাতে সাংবাদিকদের ডাকা হয়েছিল। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এক পর্যায়ে বললেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ‘এই আন্দোলন’ অব্যাহত থাকবে। শুনে আমার মনে খুব ধন্দ লাগলো। বুঝতে পারলাম না কোন্ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এই মুহূর্তে বিএনপির ডাকে দেশে দৃশ্যমান কোনো আন্দোলন চলছে বলে আমার জানা নেই। আমি ভালো করে খোঁজ নিয়ে জানলাম দেশে কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয়ভাবে বা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রে আন্দোলন চলছে। যেমন বাস ড্রাইভারকে ডাকাতির অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করলে দু’একটি জেলায় বাস মালিক ও চালকরা আন্দোলন করে গাড়ি চলা বন্ধ করে দিয়েছে। দাবি না মানায় এখন ২৪টি জেলায় বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। হুমকি দিচ্ছে সারা দেশ অচল করার। উচিত ছিল আইনী লড়াই করে অভিযুক্ত ড্রাইভারকে মুক্ত করা। কিন্তু তারা দেখেছে এর চেয়ে সহজ দেশবাসীকে জিম্মি করা। যাত্রীসাধারণ এই গরমে নিদারুণ কষ্ট পাচ্ছে। জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সবাই বিশ্বাস করে মানুষকে জিম্মি করে এভাবে তারা ড্রাইভারকে নিশ্চয়ই মুক্ত করে ফেলবে।
আমার কাছে বাস ট্রাক শ্রমিক ও মালিকদের বরাবর কাক-স্বভাবের মনে হয়। নিজ স্বার্থে একজোট হয়ে তারা সড়কপথ অচল করে দিতে পারে। অবশ্য অভিন্ন স্বার্থ কাজ করে বলে এরা জোটবদ্ধ হতে পারে সহজেই। বাস ড্রাইভার গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ মারুক, ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকুক, ফিটনেস সার্টিফিকেট না থাকুক গাড়ির, বেআইনীভাবে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে বা অন্যায় ওভারটেকিং করে অ্যাকসিডেন্ট করুক—পুলিশ টু শব্দটি করতে পারবে না। এদের বিচার করা যাবে না। তাহলে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়ে যাত্রীদের জিম্মি করা হবে। এক পর্যায়ে সরকার বাধ্য হবে অন্যায় আবদার মেনে নিতে। এসব দেখে দেখে মালিক চালকরা জানেন তাদের সাতখুন মাফ করতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য।
১২-১৩ বছর আগের কথা মনে হলো। পারিবারিক ভ্রমণে গিয়েছিলাম কক্সবাজার। আমাদের সাথে ছিল একটি মাইক্রোবাস। কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটক অনেক। ভ্রমণ পরিকল্পনা অনুযায়ী এক সকালে গাড়িতে তেল ভরে টেকনাফের উদ্দেশে যাত্রা করবো। ফিলিং স্টেশনে এসে দেখি হাহাকার। অনেক গাড়ি এসে ভরে গেছে কিন্তু ফিলিং স্টেশন তেল দিচ্ছে না। কারণ আগের রাতে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার আসতে একটি তেলের লরি মানুষ চাপা দিয়েছে। পুলিশ চালককে আটক করেছে। ব্যস, তাত্ক্ষণিক ধর্মঘট শুরু হয়ে যায়। কোথাও জ্বালানি সরবরাহ করা হবে না। জিম্মি হয়ে পড়লো অসংখ্য পর্যটক। এবার জেলা প্রশাসনও আরেক দফা জিম্মি করলো। ফিলিং স্টেশনে তেল মওজুদ আছে কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশে তেল সরবরাহ বন্ধ। আমরা কয়েকজন জেলা প্রশাসকের কাছে গেলাম। তাদের কথা, বাইরে থেকে সরবরাহ বন্ধ তাই প্রশাসনের গাড়িসমূহের জন্য রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। তখন বুঝেছিলাম পর্যটন অঞ্চলের প্রশাসন পরিচালনার জন্য বোধহয় আলাদা ট্রেনিং দরকার। অনেক বোঝানোর পর প্রতি গাড়ির জন্য ৫ লিটার তেল বরাদ্দ পেলাম। যাতে অন্তত শহর থেকে বেরুনো যায়। সকাল এগারোটার মধ্যে জানলাম অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তেলের লরি আসছে। কারণ পুলিশ বাধ্য হয়েছে ড্রাইভারকে ছেড়ে দিতে।
আন্দোলন চলছে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর মধ্যে আছে ভিসি বিরোধী আন্দোলন। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্দোলন। আবার কোথাও কোথাও খুব সংকীর্ণ স্বার্থের আন্দোলনও চলছে। যেমন এ মুহূর্তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ কেন্দ্রিক আন্দোলন চলছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কোনো বিভাগের শিক্ষাক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ভবন ও কক্ষ নেই। একটি চারতলা ভবন তৈরি হয়েছে। যে বিভাগ এতদিন কষ্ট করে নীচতলায় ক্লাস পরীক্ষা চালাচ্ছিল তারা এবার বেশ সচ্ছল। প্রয়োজনীয় কক্ষ পেয়ে গেছে। আরো অনেক উদ্বৃত্ত কক্ষ আছে। যে বিভাগের মোটেও মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই তাদের দেয়া হয়েছে নতুন স্পেস। ব্যস, শুরু হয়ে গেছে আন্দোলন। পুরনোরা ঢুকতে দেবে না নতুনদের। কারণ ভবিষ্যতে কোনো এককালে এই স্পেস তাদের লাগবে সুতরাং তোমরা থাক গাছতলায়। এই অদ্ভুত স্বার্থবাদী আন্দোলন প্রথম শিক্ষকগণ শুরু করেন পরে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা হয়। নানা কমিটি করে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সফল হতে পারে না। অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেট স্পেস ভাগ করে সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আদেশ দিলেও তা কার্যকর হয়নি। এমন অদ্ভুত সংকীর্ণ আন্দোলনেও জিম্মি হয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা জীবন। প্রায় দু’মাস ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে সেশনজটকে এগিয়ে দেয়া হয়েছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেকটি নবীন বিভাগ রয়েছে। কয়েকজন নবীন শিক্ষক পরিচালনা করেন বিভাগটি। বিভাগীয় সভাপতির প্রতি নানা কারণে বেশিরভাগ শিক্ষক নাখোশ। তাই তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সভাপতির পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন করছেন। সেখানেও জিম্মি হয়েছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা ক্লাস বর্জন করে অর্থাত্ ছাত্র-ছাত্রীদের জিম্মি করে দাবি আদায় করতে চাইছে। এভাবে সকল পর্যায়ে দাবি আদায়ে জিম্মি সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে।
হাসপাতালে চড়াও হয়েছে ক্ষিপ্ত রোগীর স্বজনরা। লাঞ্ছিত করেছে ডাক্তার বা নার্সকে। অথবা ডাক্তারদের কোনো বড় দাবি-দাওয়া আছে। এসবের প্রতিকারের যৌক্তিক কোনো পথ আজকাল খোলা থাকে না। ডাক্তার নার্সরা জিম্মি করে ফেলেন রোগীদের। বন্ধ করে দেন হাসপাতালের চিকিত্সা সেবা।
বিএনপির আন্দোলনের অস্তিত্ব খুঁজতে গিয়ে আমি এ ধরনের কতগুলো চলমান আন্দোলনের খোঁজ পেলাম। ভাবলাম মওদুদ আহমদের মত সিনিয়র নেতা যখন বলেছেন বিএনপির আন্দোলন এখনো চলমান তা হলে সন্দেহ হলো উপরের এসব চলমান আন্দোলনের সাথে বিএনপি যুক্ত কিনা। অথবা অদৃশ্য আন্দোলনও হতে পারে। কারণ বিএনপি নেত্রী গত ৫ জানুয়ারি সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে বলেছিলেন লাগাতার অবরোধ অব্যাহত থাকবে। যদিও তখনো কোনো চলমান অবরোধের অস্তিত্ব ছিল না। এরপরে অবরোধের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছিল লাগাতার হরতাল। পরে একসময় গণবিরোধী অবরোধ হরতাল অকার্যকর হওয়ায় বিএনপি বাধ্য হয় হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে। দেশ আবার দমবন্ধকর আন্দোলন থেকে—জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু কার্যকর না থাকলেও লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি দলীয় ঘোষণায় উঠিয়ে নেয়ার কথা শুনিনি। তবে কি মওদুদ আহমদ এই অদৃশ্য অবরোধ অব্যাহত থাকার কথা বলেছেন। এভাবে হলে অবশ্য সারাজীবন আন্দোলন অব্যাহত থাকলেও কারো আপত্তি থাকবে না।
আমাদের রাজনীতির নেতাদের ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে কোনো যুক্তি, বাস্তবতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মনোভঙ্গীর প্রকাশ সাধারণত দেখতে পাই না। ‘আন্দোলন’ নামের সাথে একটি গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ের ঘ্রাণ থাকে। কিন্তু সেখানে এখন গণস্বার্থ নয় গোষ্ঠীস্বার্থ সংরক্ষণের প্রবণতাই বেশি প্রকাশিত। মানব পাচারকারীরা অসহায় মানুষদের কলজে খামচে ধরছে নিজেদের লোভী হাতে, বাস শ্রমিক ও মালিকরা নিজেদের স্বার্থ আদায় করতে জিম্মি করছে গণমানুষকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা নিজেদের লক্ষ্য পূরণে জিম্মি করছেন ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা জীবনকে আর রাজনীতিকরা জিম্মি করছেন জনগণকে। মানুষের সায়-সমর্থন আছে কিনা একে পরোয়া না করে তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন হিংসা ছড়ানো হরতাল কর্মসূচি। শিক্ষকরা তাদের আন্দোলন সফল করতে ক্লাস বর্জন করে সেশনজটের পথ তৈরি করছেন। এভাবে দেশটাই যেন জিম্মি হয়ে যাচ্ছে নানা ধারার স্বার্থবাদীদের হাতে।
আমরা মনে করি আন্দোলন পরিচালনার একটি ভিন্নধারা তৈরি করা উচিত। অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, জিম্মি করে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি। নিজ সামর্থ্যে—নিজেদের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে সরকার বা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির পথ তৈরি হোক। ইচ্ছের বিরুদ্ধে অন্যের ক্ষতি করে অন্যপক্ষকে জিম্মি করার মধ্য দিয়ে দাবি আদায়ের আন্দোলন কখনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন হতে পারে না।
n লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
