একনেকে ৯ প্রকল্প অনুমোদন

অতি দরিদ্র নারীদের জন্য ‘স্বপ্ন’ প্রকল্প

আপডেট : ২৭ মে ২০১৫, ০০:০০

বিভিন্ন কাজে দরিদ্র নারীদের দৈনিক ২০০ টাকা করে মজুরি দেয়া হবে। এ মজুরি থেকে দৈনিক ৫০ টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হবে। ফলে দেড় বছরে তার ২৫ হাজার টাকা জমা হয়ে যাবেG

 
গ্রামীণ অতি দরিদ্র মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। দেশের ২২ জেলার ১০৬ উপজেলার ১০৩০ ইউনিয়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। গতকাল শেরেবাংলা নগরস্থ এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়।
 
৮৫৩ কোটি টাকার অনুমোদিত এ প্রকল্পের নাম ‘সম্ভাবনাময় উত্পাদনশীল কাজে নারীদের সক্ষমতার উন্নয়ন’-সংক্ষেপে এ প্রকল্পের নাম ‘স্বপ্ন’। প্রকল্পটিতে সরকার ২১৩ কোটি টাকা দেবে। বাকি ৬৪০ কোটি টাকা অনুদান আকারে দেবে ইউএনডিপি। এ প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে দরিদ্র নারীদের দৈনিক ২শ’ টাকা করে মজুরি দেয়া হবে। এ মজুরি থেকে দৈনিক ৫০ টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হবে। ফলে দেড় বছরে তার ২৫ হাজার টাকা জমা হয়ে যাবে। পরবর্তীতে এ পুঁজি খাটিয়ে তারা আরো আয় বাড়াতে পারবেন।
 
পরিকল্পনা কমিশনসূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত অসহায় মহিলাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে গ্রাম থেকে শহরে কাজের সন্ধানে আসা নারীদের সংখ্যা কমবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা। ইউএনডিপির সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, চরম দারিদ্র্য প্রবণ এলাকার সুবিধাবঞ্চিত এবং অসহায় মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটির গুরুত্ব উপস্থাপনে স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে এবং এর অধিকাংশই নারী। গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় দরিদ্র এ সব মানুষ শহরে অভিগমন করে থাকে। দেশ জাতীয় প্রবৃদ্ধি এবং মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি লাভ করলেও এখনো বাংলাদেশে দারিদ্র্য ফাঁদ বিদ্যমান। এ ফাঁদ দূর করার জন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে গত দুই দশকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন হয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এবং উন্নয়ন সহযোগীরা একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন স্কিম বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অতিদরিদ্র মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ উদ্দেশ্যেই প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে- গ্রামীণ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর মেরামত এবং সংস্কার, সেবা প্রদানের জন্য থোক অনুদান দেয়া, এনজিওর মাধ্যমে মহিলা উপকারভোগীদের প্রশিক্ষণ, যানবাহন ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, জনবল নিয়োগ এবং সরবরাহ ও সেবা প্রদান।
 
প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ৫৮৬৮ কোটি টাকার ৯টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকার দেবে ২২৭০ কোটি টাকা। প্রকল্প সাহায্য হিসাবে আসবে ৩৫৬৭ কোটি টাকা। বাকি ৩১ কোটি টাকা সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে যোগান দেয়া হবে। অনুমোদিত ৯টি প্রকল্পের মধ্যে নতুন প্রকল্প ৬টি এবং সংশোধিত প্রকল্প ৩টি।
 
সভা শেষে পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল জানান, ভারতীয় ঋণ সহায়তায় খুলনা থেকে মংলা পর্যন্ত একটি নতুন রেললাইন নির্মাণ করবে সরকার। একই সাথে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত বিদ্যমান রেললাইনের সংস্কারও  হবে এই ঋণ সহায়তা দিয়ে। এ জন্য দু’টি সংশোধিত প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়।
 
খুলনা থেকে মংলা পর্যন্ত নতুন রেললাইন স্থাপনের জন্য অনুমোদিত সংশোধিত প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮০১ কোটি টাকা। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি যখন প্রথম অনুমোদিত হয় তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭২১ কোটি টাকা। সংশোধিত এ প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে পরিকল্পনা মন্ত্রী জানান, রেলপথের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে রূপসা নদীতে প্রায় ৭১৭ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি রেলসেতু নির্মাণ করতে হবে। সেই সঙ্গে রেললাইনের দৈর্ঘ্য ১২ কিলোমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও নতুন করে কিছু জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এখন এ প্রকল্পের আওতায় খুলনা থেকে মংলা পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন নির্মিত হবে। সেই সঙ্গে ২১ কিলোমিটার লুপ লাইন তৈরি হবে। এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজে (রূপসা রেলসেতুসহ) প্রায় ২২০০ কোটি টাকা খরচ হবে। অপরদিকে, ৬৭৮ একর ভূমি অধিগ্রহণে খরচ হবে ১০০০ কোটি টাকা। সংশোধিত এ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ভারত সরকার ঋণ সহায়তা হিসেবে ২৩৭১ কোটি টাকা দেবে। বাকি ১৪৩০ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের এ প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুন নাগাদ সম্পন্ন হবে ।
 
গতকাল একনেক সভায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথটি পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এজন্য একনেকে ৬৭৮ কোটি টাকার একটি সংশোধিত প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকার দেবে ১২২ কোটি টাকা। বাকি ৫৫৬ কোটি টাকা ভারত সরকার বাংলাদেশকে ঋণ হিসাবে দেবে। উল্লেখ্য, রেল চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় এ রেলপথটি ২০০২ সাল থেকে বন্ধ আছে। সরকার বলছে, সাড়ে ৫১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ রেলপথটিকে আরো ৯ কিলোমিটার বাড়িয়ে ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত ডুয়েল  গেজে রূপান্তরিত করে চালু করা হবে।
 
সভায় সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে অবস্থিত মিল্কভিটায় নতুন করে আরো একটি গুঁড়ো দুধ তৈরির প্ল্যান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। এ জন্য ‘সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ঘাটে গুঁড়ো দুগ্ধ কারখানা স্থাপন’ নামক ৭৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়।
 

একনেক সভায় অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হলো, ৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নসহ সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প, ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে জামালপুর শহর বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্প, ৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কনস্ট্রাকশন অব কোরস অব মিলিটারি পুলিশ সেন্টার এন্ড স্কুল এট সাভার ক্যান্টনমেন্ট প্রকল্প, ২১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে হ্যাচারিসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার স্থাপন প্রকল্প এবং ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার মানিকনগর এলাকায় মেঘনা নদীর বাম তীরে প্রতিরক্ষামূলক প্রকল্প।